সংকটের মধ্যেও যুক্ত হচ্ছে নতুন ট্রেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পদ্মা সেতু রেলপথে আগামী ১০ আগস্ট চালু হচ্ছে নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন ‘অভিযাত্রী কমিউটার’। এর মধ্য দিয়ে আরেকটি রেল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য। তবে নতুন ট্রেন চালুর আগেই রেলপথের নিরাপত্তা ও পরিচালনা ব্যবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা স্টেশনে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যত অচল। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই রেলপথে ট্রেন চালাতে হচ্ছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের বিভিন্ন স্থানে চুরি হয়েছে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কেবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম। এতে ব্যাহত হচ্ছে ইন্টারলকিং ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার পূর্ণ কার্যকারিতা।
মাওয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম খোকন বলেছেন, ‘চারটি লাইনের মধ্যে বর্তমানে দুটি ব্যবহার করে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় ফোনে যোগাযোগ এবং চালকদের লিখিত নির্দেশনা দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।’
রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিগন্যাল ব্যবস্থা শুধু ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা দেয় না, এটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধেরও অন্যতম প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা। একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অকার্যকর হলেও পুরো ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাকিউল্লাহ সিদ্দিক বলেছেন, ‘দেশের অন্যতম আধুনিক রেলপথে এমন প্রযুক্তিগত দুর্বলতা উদ্বেগের বিষয়। নতুন ট্রেন চালুর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেনটির নম্বর হবে ১৩৫/১৩৬। আটটি কোচের এই ট্রেনে ৬০৯টি আসন থাকবে। ট্রেনটি প্রতিদিন বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ পৌঁছাবে। ফেরার পথে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। শনিবার থাকবে সাপ্তাহিক বন্ধ। পথে কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগর, মাওয়া, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা ও মহেশপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু রেলপথের বিভিন্ন স্থানে সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব সরঞ্জাম রক্ষায় সুরক্ষা খাঁচা স্থাপন করা হয়েছে। চুরি হওয়া যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং নিরাপত্তা জোরদারে কাজ চলছে। তবে চুরি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।’
অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরও বলেছেন, ‘সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি ও জনবল সংকটের কারণে নিমতলা এবং শ্রীনগর স্টেশনে অস্থায়ী জনবল দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবলও বাড়ানো হবে। তবে সিগন্যাল ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে।’
এদিকে প্রযুক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি রেলপথ জুড়ে জননিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত দুই বছরে মুন্সীগঞ্জে ট্রেনে কাটা পড়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ সময় মোট ৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনের পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নজরদারি ও জনসচেতনতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা এলাকায় মানুষের অবাধ চলাচল এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম আজাদের বক্তব্য, ‘কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তি সিগন্যালের যন্ত্রাংশ চুরি করছে। এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। প্রতিটি স্থানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় জনগণকেও রেলওয়ের সম্পদ রক্ষায় সচেতন হয়ে সহযোগিতা করতে হবে।’




