৪৪ বছর নিঃস্বার্থ খেদমত, আজ ভাঙা পায়ে কান্না

মসের উদ্দিন সমছু
ভোরের আলো ফোটার আগেই মসজিদ থেকে ভেসে আসত আজানের সুমধুর ধ্বনি। সেই আজানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৪৪ বছরের এক মানুষের জীবন। নাম সমসের উদ্দিন সমছু। বয়স ৮২ বছর।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের শাহপুর আলীনগর জামে মসজিদের এই মোয়াজ্জিন দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই করে আসছেন মসজিদের খেদমত।
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছেন। তবুও থামেনি তার দায়িত্ব। কৃষিকাজের ব্যস্ততা, সংসারের নানা ঝামেলা—কোনো কিছুই তাকে মসজিদের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে পারেনি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেওয়া, মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মুসল্লিদের জন্য মসজিদ প্রস্তুত রাখাই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।
কিন্তু গত ১৯ জুলাই মেয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। ভোররাত প্রায় ৩টা। তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের জন্য অজু করতে ঘরের বাইরে টিউবওয়েলের কাছে যান সমছু। একপর্যায়ে পা পিছলে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এতে তার পায়ের উরুর হাড় ভেঙে যায়। এরপর থেকে ২৫ দিন ধরে মসজিদে যেতে পারছেন না তিনি।
মসজিদের কথা উঠতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ৮২ বছরের এই বৃদ্ধের। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
সমসের উদ্দিন সমছু বলেন, ‘৪৪ বছর ধরে মসজিদে আজান দিছি। কোনোদিন টাকার জন্য এই কাজ করি নাই। কৃষিকাজ করছি, কিন্তু কাজের ব্যস্ততা কোনোদিন আজানের সময় আটকাতে পারে নাই। এখন পায়ে আঘাত পাইয়া মসজিদে যেতে পারি না—এই কষ্টটাই বেশি।’
তার জীবনের সঙ্গে ধর্মীয় দায়িত্ব যেন একসূত্রে গাঁথা। গত বছর তিনি ওমরাহ হজ পালন করেছেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সমছুর মূল পেশা কৃষিকাজ। নিজের জমিতে কাজ করেছেন, সংসার চালিয়েছেন; পাশাপাশি দিনের পাঁচ ওয়াক্তে ছুটে গেছেন মসজিদে।
ছেলে আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘বাবা মসজিদ ছাড়া থাকতে পারেন না। ২৫ দিন ধরে মসজিদে যেতে না পারায় তার মন খুব খারাপ। মসজিদের কথা মনে হলেই কান্না করেন। সুস্থ হয়ে আবার আজান দিতে চান।’
শাহপুর আলীনগর জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আকছির মিয়া তালুকদার বলেন, ‘সমছু মিয়া দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে মসজিদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কোনো বেতন নেননি। তার মতো মানুষ এখন খুবই কম। আমরা তার দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করছি।’
ইউপি সদস্য নূরুল হাসান তপু বলেন, ‘বৃদ্ধ বয়সেও তিনি যেভাবে মসজিদের খেদমত করেছেন, তা সত্যিই বিরল। নিজের কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেওয়া এবং মসজিদ পরিষ্কার রাখা তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।’
হবিগঞ্জ বায়তুল আমান জামে মসজিদের খতিব মুফতি আলমগীর হোসাইন সাইফি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, সমছু মিয়া নিঃস্বার্থভাবে মসজিদের খেদমত করে আসছেন। কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই এত দীর্ঘ সময় মসজিদের সেবা করা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।’






