৪৫ বছর পর শেকড়ের সন্ধানে সেলিনা
- শৈশবের একটি ছবি ও পুরনো পাসপোর্টই সম্বল
- খুঁজছেন জন্মদাতা মা-বাবাকে

সেলিনা গোমেজ
শৈশবের কোনো স্মৃতি নেই। মনে নেই জন্মদাতা মা-বাবার চেহারা, নিজের বাড়ি, গ্রামের পথ কিংবা স্বজনদের মুখ। শুধু পুরনো কিছু কাগজপত্রে লেখা জন্মস্থান আর মা-বাবার নামটুকুই সম্বল। সেই নাম ও জন্মস্থানের সূত্র ধরে সুদূর নেদারল্যান্ডস থেকে আবারও জন্মভূমি বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন সেলিনা গোমেজ। হাতে শৈশবের একটি সাদাকালো ছবি, সঙ্গে পুরনো পাসপোর্টের ফটোকপি। এসব আঁকড়েই কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট ও আশপাশের এলাকায় খুঁজে ফিরছেন নিজের জন্মদাতা মা-বাবা ও স্বজনদের।
মাত্র দেড় বছর বয়সে এক নারীর সঙ্গে ঢাকা যাওয়ার পর একটি ডাচ পরিবার তাকে দত্তক হিসেবে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে চার দশকের বেশি সময়। নেদারল্যান্ডসের নাগরিক হিসেবে সেখানেই বেড়ে ওঠা সেলিনার জীবনে কোনো কিছুর অভাব না থাকলেও জন্মদাতা পরিবারের পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরায়নি। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই বারবার বাংলাদেশে ছুটে আসছেন তিনি। এবারও তার একটাই চাওয়া, জীবনের কোনো এক প্রান্তে খুঁজে পাওয়া সেই মা-বাবাকে।
সেলিনা গোমেজের জন্ম কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায়। তার কাছে থাকা পুরনো পাসপোর্টের ফটোকপিতে জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১৯৮১ সালের ৭ জুলাই। সেখানে জাতীয়তা লেখা বাংলাদেশি। জন্মদাতা মা-বাবার নামও জানতে পেরেছেন তিনি। মায়ের নাম হেলেনা গোমেজ, বাবার নাম বেনেডি গোমেজ।
গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশে আসেন সেলিনা। এরপর থেকে ডুলহাজারার মালুমঘাট, খুটাখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছেন জন্মদাতা পরিবারের সন্ধানে। সম্ভাব্য এলাকায় মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন নিজের পরিচয় ও পরিবারের খোঁজসংবলিত লিফলেট। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ তার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানেন কি না, সেই আশায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটছেন।
সেলিনার কাছে জন্মভূমির স্মৃতি বলতে তেমন কিছুই নেই। বাংলা ভাষাও বলতে পারেন না। তবু নিজের শেকড়ের সন্ধানে তার এই প্রচেষ্টা থেমে নেই। শৈশবের ছবিটি আর পুরনো পাসপোর্টের ফটোকপি এখন তার কাছে শুধু পরিচয়ের দলিল নয়। বরং খোঁজে না পাওয়া পরিবারের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র সূত্র।
ইংরেজিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সেলিনা গোমেজ বলেছেন, ‘আমি আমার মা-বাবাকে খুঁজছি। তাদের খুব মিস করি। তাদের মনে করতে পারি না। তবে জানি, আমার মায়ের নাম হেলেনা গোমেজ এবং বাবার নাম বেনেডি গোমেজ। নেদারল্যান্ডসে আমি নিজেকে একা অনুভব করি। আশা করি, একদিন মা-বাবাসহ আমার পরিবারের সবাইকে খুঁজে পাব।’
নিজের জন্ম ও দত্তক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার জন্ম মালুমঘাটে। একজন নারী আমাকে মাত্র দেড় বছর বয়সে ঢাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে একটি ডাচ পরিবার আমাকে দত্তক নিয়ে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যায়। তারা আমাকে অনেক আদর-যত্নে বড় করেছেন। কিন্তু আমার আসল পরিবার বাংলাদেশে। আমি তাদের সঙ্গে আবারও একত্রিত হতে চাই।’
সেলিনার এই অনুসন্ধানে সহযোগিতা করছেন তার বাংলাদেশ সফরের গাইড ও ভ্রমণ সহকারী রাসেল আলম। তিনি জানিয়েছেন, জন্মদাতা পরিবারের সন্ধানে এর আগেও কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন সেলিনা। প্রায় সাত-আট বছর আগে প্রথমবার দেশে আসেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এলেও এখনো পরিবারের সন্ধান পাননি। এবারও দীর্ঘদিনের সেই অনুসন্ধানকে এগিয়ে নিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর চালানো হচ্ছে।
রাসেল আলম বলেছেন, সেলিনা আরও ১০ থেকে ১৫ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবেন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজারে রয়েছেন। এ সময় তারা দুজন মিলে মালুমঘাট, খুটাখালীসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তার পরিবারের সন্ধান চালিয়ে যাবেন।
তিনি আরও জানান, সেলিনার জন্মদাতা মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন কিংবা তার পরিবারের বিষয়ে কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে হেলেনা গোমেজ ও বেনেডি গোমেজ নামের কাউকে চিনে থাকলে অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের সন্ধান জানলে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সেলিনা গোমেজের পরিবারের সন্ধান পেতে সহযোগিতা করতে চাইলে রাসেল আলমের সঙ্গে ০১৭১৮-৬০৪৩৪৭ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া ই-মেইল করা যাবে [email protected] ঠিকানায়।
##




