সখীপুরে ফুলেল সজ্জিত গাড়িতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে বিদায়

ক্যাম্পাস থেকে ফুলেল সজ্জিত গাড়িতে করে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন আব্দুল হান্নান মিয়া। ছবি : আগামীর সময়
দীর্ঘ ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল হান্নান মিয়া। তবে শেষ কর্মজীবনের বিদায়টা হয়ে থাকল স্মরণীয়।
প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে এগিয়ে আসেন সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। স্মৃতিচারণ, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় ভরে ওঠে কলেজ ক্যাম্পাস। অনুষ্ঠান শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে একটি গাড়িও সাজানো হয় ফুল দিয়ে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজ মিলনায়তনে মো. আব্দুল হান্নান মিয়ার আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ এম এ রউফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিদায়ী শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিদায়ী শিক্ষকের ছোট ভাই চিকিৎসক হাফিজুর রহমান, কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম জাকির হোসাইন, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এম ওয়াজেদ আলী, মো. ফারুক হোসেন, মুহাম্মদ আবদুল আলীম, আহাম্মদ আলী মিয়া, নজরুল ইসলাম খান ও রফিকুল হক বাদল।
দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বিকেল চারটার দিকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ফুলেল সজ্জিত গাড়িতে করে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন আব্দুল হান্নান মিয়া।
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হন তিনিও।
কলেজ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার পরপরই ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ইসলাম শিক্ষা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন আব্দুল হান্নান মিয়া।
এরপর আট বছর প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক হন।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন তিনি।
তার শেষ কর্মদিবস ছিল গত ১৯ অক্টোবর। তবে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সে সময় কলেজ বন্ধ থাকায় ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বিদায় জানানো সম্ভব হয়নি। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার কলেজ কর্তৃপক্ষ তার সম্মানে এই সংবর্ধনার আয়োজন করে।
কলেজের শিক্ষার্থী ঝুমা আক্তার জানিয়েছেন, আব্দুল হান্নান মিয়া ছিলেন খুব ভালো মনের মানুষ এবং একজন অতুলনীয় শিক্ষক।
তার ভাষ্য, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি স্যারের কাছ থেকে স্নেহ ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। প্রিয় শিক্ষকের সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য তিনি দোয়া করেছেন।
আরেক শিক্ষার্থী কারিমা আক্তার মুন্নি জানিয়েছেন, স্যার ছিলেন তার প্রিয় শিক্ষক এবং অনুপ্রেরণার অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা, সুপরামর্শ এবং পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্নাতকের শিক্ষার্থী আলেয়া আফরোজ জানিয়েছেন, তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেও একই কলেজে পড়েছেন। একটানা চার বছর আব্দুল হান্নান মিয়ার কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছে তার।
তার ভাষ্য, ক্লাসে কোনো বিষয় একবারে বুঝতে না পারলে স্যার বারবার বুঝিয়ে দিতেন। স্যার আর ক্লাসে পড়াবেন না, এই ভাবনাই তাকে কষ্ট দিচ্ছে।
কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মু. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আব্দুল হান্নান মিয়া শুধু তার সহকর্মীই ছিলেন না, ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ।তার ভাষ্য, ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে আব্দুল হান্নান মিয়া তাকে নীতি ও আদর্শের নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।তিনি আরও উল্লেখ করেন, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার যে পথ শিক্ষক তাকে দেখিয়েছেন, তা সারাজীবন অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।তার মতে, আব্দুল হান্নান মিয়া ছিলেন আপাদমস্তক বিনয়ী, সরল ও ভদ্র মানুষ। কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলা তার স্বভাবে ছিল না। তিনি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন।কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম জাকির হোসাইন জানিয়েছেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন ২৮ জন শিক্ষকের মধ্যে আব্দুল হান্নান মিয়া ছিলেন অন্যতম। কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল অনন্য।কলেজের অধ্যক্ষ এম এ রউফও তাকে একজন ভালো মনের মানুষ ও দক্ষ শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিদায়ী শিক্ষকের সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন।বিদায়ী শিক্ষক মো. আব্দুল হান্নান মিয়া জানিয়েছেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছে।তার ভাষ্য, এই সম্মান তিনি কোনো দিন ভুলবেন না। যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন তার শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের স্মৃতি মনে রাখবেন।কলেজের সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের ভালোবাসা ও সম্মান তার শিক্ষকতা জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।



