টানা বর্ষণে রূপগঞ্জে সাপের উপদ্রব, আতঙ্কে মানুষ

সংগৃহীত ছবি
টানা বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও খাল-বিলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিষধর সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মানুষের বসতবাড়ি, গ্যারেজ, রান্নাঘর, এমনকি বহুতল ভবনেও পদ্মগোখরা, খৈয়াপানশ, রাজকেউটসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপের দেখা মিলছে। এতে এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছরে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ২৫২টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সাপের উপদ্রব আরও বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
রূপগঞ্জের জাকারিয়া মিয়া বললেন, গত সপ্তাহে বাড়ির পুকুরপাড়ে সাড়ে তিন হাত লম্বা একটি বিষধর সাপ মেরেছি। আগেও মোশারফের ঘর থেকে চার হাত লম্বা একটি গোখরা সাপ মারা হয়েছে। নগরপাড়া-বালুর সড়ক এলাকায়ও প্রায়ই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ দেখা যাচ্ছে।
তেতলাব খালপাড় এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর মিয়ার মতে, রাতে দেখি দুটি সাপ বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছে। ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। একটি চার হাত লম্বা সাপ মারা গেলেও অন্যটি পালিয়ে যায়।
শান্তিনগর এলাকার গৃহবধূ কল্পনা আক্তার বলেন, রাতে টয়লেটে যেতেও ভয় লাগে। কয়েক দিন আগে রান্নাঘরে একটি সাপ দেখা যায়। এরপর থেকে সন্তানদের একা কোথাও যেতে দিচ্ছি না। আগে বছরে দু-একবার সাপ দেখতাম, এখন প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় সাপ পাওয়ার খবর শুনছি।
গত ১ জুলাই উপজেলার একটি বাড়ির ফ্লোর ভেঙে দুটি পদ্মগোখরা, সাতটি বাচ্চা সাপ ও ১৮টি ডিম উদ্ধার করা হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ হোসেন। এ ঘটনার পর আতঙ্কে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়ারা বাসা ছেড়ে চলে যান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা জানালেন, কয়েক বছর আগে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে জলাশয় ভরাট, আবাসস্থল সংকট এবং টানা বৃষ্টিতে সাপের গর্তে পানি ঢুকে যাওয়ায় সাপ শুকনো ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতবাড়িতে চলে আসছে। বাড়ির গেটের লতানো গাছ বেয়ে সাপ বহুতল ভবনেও উঠে যেতে পারে। এ ছাড়া বাড়ির আশপাশে খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখলে সেখানে ইঁদুরের সংখ্যা বাড়ে, আর ইঁদুরের সন্ধানে সাপও বসতবাড়িতে প্রবেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, সাপের কামড়ের ঘটনা গ্রামাঞ্চলেই বেশি ঘটে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ১১টি প্রতিষ্ঠানের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, সাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশই গ্রামের বাসিন্দা এবং এসব ঘটনার প্রায় ২৪ শতাংশ বিষধর সাপের কামড়ে ঘটে।
চিকিৎসক ডা. তানসিব জুবায়ের নাদিম বলেন, বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত স্থানে তীব্র ব্যথা, ফোলা, রক্তপাত, ফোসকা, চোখের পাতা ঝুলে পড়া, শ্বাসকষ্ট, রক্তক্ষরণ, কিডনির জটিলতাসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের ঝাড়ফুঁক বা বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সজল কুমার দাস বলেন, সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাপ ইঁদুর ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। এ ছাড়া সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরি হয়। তাই অকারণে সাপ হত্যা না করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাপে কামড় দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশেষজ্ঞরা রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট ব্যবহার, বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা অপসারণের মাধ্যমে সাপের উপদ্রব কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। টানা বর্ষণে রূপগঞ্জের খাল-বিল ও নিচু এলাকায় পানি জমে থাকায় আগামী দিনগুলোতে সাপের উপদ্রব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।





