চোরদের চিনেছিলেন বাশার, সেটাই হলো কাল

সংগৃহীত ছবি
রাতের নীরবতা ভেঙে ঘরের দরজা খুলেছিলেন বাশার গাজী। বুঝতে পারেন, তার অটোভ্যান চুরি করতে এসেছেন কয়েকজন। বাধা দিতে গিয়ে দুজনকে চিনেও ফেলেন। এরপর আর রক্ষা হয়নি। হাত-পা চেপে ধরে গলা টিপে হত্যা করা হয় তাকে।
পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সাজানো দৃশ্যও রক্ষা করতে পারেনি খুনিদের।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), মুন্সীগঞ্জ। এ ঘটনায় শামীম শেখ (৩৯), রাজন (৩৬) ও কাউসার মোল্লা (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেখানো তথ্যে উদ্ধার করা হয়েছে বাশারের চুরি যাওয়া অটোভ্যান।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার রাতের পর থেকে বাশার গাজীকে আর দেখা যায়নি। তিনি কয়েকমাস ধরেই মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর মামুদাদপুরে বাড়িতে একাই বসবাস করতেন। পারিবারিক কলহের কারণে স্ত্রী-সন্তানরা ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। পেশায় অটোভ্যানচালক বাশার বিভিন্ন পোল্ট্রি ফার্মে পণ্য পরিবহন করতেন।
গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ঘর থেকে বিকট দুর্গন্ধ বের হলে প্রতিবেশীরা বিষয়টি টের পান। ঘরটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। পরে পুলিশ গিয়ে অর্ধগলিত অবস্থায় বাশারের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। পরের দিন বুধবার নিহতের স্ত্রী জান্নাতুন নেছা টঙ্গীবাড়ী থানায় হত্যা ও চুরির মামলা করেন।
মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হলে তিন আসামিই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই মুন্সীগঞ্জ জেলা ইউনিটের ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আছমা আরা জাহান জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে অটোভ্যানটি চুরি করতে শামীম, রাজন, কাউসারসহ পাঁচজন বাশারের বাড়িতে যান। ভ্যান নিয়ে যাওয়ার সময় বাশার জেগে উঠে তাদের দেখতে পান এবং শামীম ও কাউসারকে চিনে ফেলেন। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাশারকে মারধর করে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান তারা। একপর্যায়ে কয়েকজন মিলে তার হাত-পা চেপে ধরে এবং কাউসার গলা চেপে ধরলে প্রায় পাঁচ মিনিট পর বাশারের মৃত্যু হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে রশি দিয়ে লাশ ঝুলিয়ে রেখে তারা অটোভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাতে পিবিআই জানিয়েছে, রবিবার সন্ধ্যায় কাউসার রাজনের দোকানে গিয়ে তাকে একটি কাজের প্রস্তাব দেন। ওই কাজের জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেন। পরে রাজন, কাউসার, শামীম এবং শামীমের দুই সহযোগী জুয়েল ও দেলু মিলে বাশার গাজীর অটোভ্যান চুরির পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ১২টার দিকে পাঁচজন বাশারের বাড়িতে যান। তারা ঘরে ঢুকে অটোভ্যানটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শব্দ পেয়ে বাশার ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরে বের হন। সামনে পাঁচজনকে দেখে তিনি শামীম ও কাউসারকে চিনে ফেলেন। তখন বাশার তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোরা আমার বাড়িতে চুরি করতে আসছোস, তোদের খবর আছে।’
বাশার তাদের চিনে ফেলায় ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন পাঁচজন মিলে তার ওপর হামলা চালায়। কিল-ঘুষি মারার পাশাপাশি বাশার চিৎকার করতে চাইলে কাউসার তার মুখ চেপে ধরেন। এরপর তাকে জোর করে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাজন বাশারের দুই হাত চেপে ধরেন। শামীম ও জুয়েল তার দুই পা ধরে রাখেন এবং দেলু পেছন থেকে তাকে চেপে ধরেন।
এ সময় কাউসার বাশারের গলা চেপে ধরে রাখেন। এভাবে প্রায় পাঁচ মিনিট পর বাশার নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তখন তারা বুঝতে পারেন, বাশারের মৃত্যু হয়েছে। হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করেন শামীম ও কাউসার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শামীম অটোভ্যানে থাকা একটি রশি নিয়ে আসেন। এরপর কাউসার ওই রশি বাশারের গলায় পেঁচিয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেন।



