কণ্ঠে মাধুর্য পেটে ক্ষুধা

ফরিদপুর শহরের অলিগলি, রেলস্টেশন, হাট-বাজার কিংবা নদীর ঘাট— যেখানেই মানুষের ভিড়, সেখানেই দেখা মেলে মধ্যবয়সী এক নারীর। খালি পায়ে হেঁটে চলা, জীর্ণ শাড়ি, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ আর এলোমেলো চুলের এই নারীকে প্রথম দেখায় অনেকেই মনে করেন ভবঘুরে। কিন্তু যখন গলা ছেড়ে গান ধরেন, তখন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘লাইলি খালা’ নামে। সম্প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান পরিবেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে পরিচিত হয়েছেন তিনি।
বাউল দর্শনে বিশ্বাসী লাইলি খালার জীবন যেন সংসারবিমুখ এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প। নেই স্থায়ী ঠিকানা বা চাওয়া-পাওয়ার হিসাব। মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো আর গান গাওয়াই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ। তবে বয়সের এই পর্যায়ে এসে তার চাওয়া খুব সামান্য— একটি ঘর, একটু জমি, আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা।
গত ২৫ মে বিকালে ময়েজ মঞ্জিলে নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন লাইলি খালা। ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন তিনিও। সেদিন তিনি গেয়ে ওঠেন নজরুলের জনপ্রিয় গান ‘নয়নভরা জল গো তোমার’। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় গাওয়া সেই গান মুহূর্তেই দর্শকদের করে আবেগাপ্লুত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রেম করে অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন লাইলি খালা। ধর্মান্তরিত হয়ে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে শুরু করেন সংসার। তাদের পরিবারে সন্তানও আসে। কিন্তু একসময় ভেঙে যায় সেই সংসার। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করলে জীবনের মোড় বদলে যায় তার।
সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হন পথের মানুষে। এরপর শুরু হয় এক ভিন্ন জীবন। যেখানে বাউল মেলা, গান কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন— সেখানেই ছুটে যান। সুযোগ পেলেই হাতে তুলে নেন মাইক্রোফোন। আর তার দরদভরা কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে যান শ্রোতারা। দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী হলেও বহু বছর ধরে তিনি সন্তানদের সংসার থেকে আলাদা। কেন তিনি এভাবে ঘুরে বেড়ান— এ প্রশ্নের উত্তরে লাইলি খালার জবাব সহজ। ‘আমি মানুষ দেখি। দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ। মিল নেই কারও সঙ্গে কারও। মানুষ দেখতে খুব ভালো লাগে আমার।’
জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা খোঁজখবর রাখছি তার। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য জমি, ঘর এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।’
তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন ফরিদপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফও। ‘খালি গলায় এত সুন্দর গান খুব কম মানুষই গাইতে পারেন। লাইলি খালাকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে’— জানিয়েছেন এমপি।




