প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে রাস্তা বানাতে ইট ‘ভাড়া’ নিয়েছিল এলজিইডি

বগুড়ার গাবতলীতে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নির্মাণ করা সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ইট
গত মাসে বগুড়া সফরে নিজের বাড়িতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উপলক্ষে তার বাড়ির সামনের আধাকিলোমিটার কাঁচা সড়কে ইটের সোলিং করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সেই ইট তুলে নেওয়া হয়। এ সড়ক দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তার পৈতৃক ভিটায় পৌঁছেছিলেন। সফর শেষে ইট সরিয়ে নেওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ ঘটনায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তবে এলজিইডির দাবি, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে জরুরি কাজের অংশ হিসেবে ওই ইট ‘ভাড়া’ করে আনা হয়েছিল। এর সঙ্গে মূল ঠিকাদারের কাজের কোনো সম্পর্ক নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার কাঁচা সড়ক পাকা করার জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মেসার্স হক ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পায়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরু করেনি।
এর মধ্যে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের ঘোষণা এলে কাঁচা সড়কটিতে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়। আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এতে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার পর সড়কের ৫০০ মিটার অংশে বিছানো সব ইট তুলে নেওয়া হয়।
নশিপুরের বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কাঁচা সড়কে সোলিং করায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিল। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব হয়েছিল। কিন্তু এখন ইট তুলে নেওয়ায় এ সড়ক দিয়ে চলাচল করা দায় হয়ে পড়েছে। মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
জরুরি ভিত্তিতে সড়কে ভাড়ায় ইট বিছানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘বাগবাড়ী এলাকায় আমার আরেকটি কাজ চলছিল। এ কারণে এলজিইডি থেকে আমাকে ডেকে দ্রুত ইট বিছানোর কাজটি করতে বলা হয়। তখন আমি ভাড়ায় ইট নিয়ে আসি। স্থানীয়দের অসহযোগিতার কারণে মূল ঠিকাদার রাস্তার কাজ শুরু করতে পারেননি। এ কারণেই অস্থায়ীভাবে ইট বিছাতে হয়েছিল। কাজ শেষে ইট আমি নিয়ে গেছি। এ কাজের জন্য এলজিইডি শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দিয়েছে। বাকি বিল এখনো পাইনি।’
এলজিইডির কর্মকর্তাদের দাবি, নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে কিছু জটিলতা ছিল। এসব কারণে কাজের গতি ধীর ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে জরুরি ভিত্তিতে কাঁচা সড়কে ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই ইট ভাড়া করে আনা ছাড়াও আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কাজ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণ ও অন্যান্য কাজের জন্য গাবতলী উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।
গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমানের ভাষ্য, ‘৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তা ৮৪ লাখ টাকায় পাকাকরণের জন্য ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে সড়কের পাশে প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে। সড়কের সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সাইট বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব হয়েছে।’
এ কাজে নিয়ম-নীতি মেনেই অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তার মন্তব্য, ‘ওই সড়ক পাকাকরণের জন্য ৮৪ লাখ টাকা আগেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাই সেখানে অস্থায়ীভাবে বিছানো ইট ঠিকাদারকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। কারণ সোলিংয়ের জন্য ইট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ইট কিনতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যেত।’
আধাকিলোমিটার সড়কটির নির্মাণকাজের মূল ঠিকাদার হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শামীম হোসেন জানান, কার্যাদেশ পাওয়ার পর কাজ শুরু করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথমত, টেন্ডার অনুযায়ী সড়কের প্রস্থ ১৬ ফুট নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনবার লে-আউট দিতে হয়েছে। কারণ পাঁচ ফুটের পর আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। স্থানীয়দের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জায়গা বের করতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া সড়কের সীমানা নির্ধারণের কাজও আলাদাভাবে করতে হয়েছে। গত মঙ্গলবার সেই কাজ শেষ হয়েছে। এখন বাকি কাজ আগস্টের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে বলে তিনি দাবি করেন।
ভাড়ায় ইট এনে বিছানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করেন, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের ক্ষেত্রে জরুরি কাজের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকে। এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত। বগুড়াতেও একইভাবে কাজ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সড়কে ইটের সোলিং করা হয়েছিল। কাজ শেষে সেই ইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকে এটিকে ভুলভাবে ‘ইট চুরি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বগুড়ার সহসভাপতি মিলন রহমান বলেছেন, ‘জরুরি বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সরকারি দপ্তরগুলো বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বিধান কী এবং তা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’





