৮ মাসই কাদা-পানিতে রাস্তা, ২ কিমি পারাপারে ঘোড়ার গাড়ি

বলারবাড়ী গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। ছবি: আগামীর সময়
বছরের প্রায় আট মাসই কাদা-পানিতে ডুবে থাকে বগুড়ার ধুনটের বলারবাড়ী গ্রামের দুই কিলোমিটার রাস্তা। সামান্য বৃষ্টিতেই বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। কঠিন হয়ে পড়ে হেঁটে চলাও। ওই গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গ্রামের প্রায় ৪ হাজার মানুষ।
ধুনট উপজেলার সর্ব দক্ষিণে গোপালনগর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের মাঝখানে বলারবাড়ী গ্রামের অবস্থান। গ্রামের দক্ষিণে কাশিয়াহাটী গ্রাম। এর পরেই সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার এলাকা। পূর্বদিকে মহিষমুড়া গ্রাম পেরোলেই কাজীপুরের সীমানা।
বলারবাড়ী বিলের মধ্যে অবস্থিত গ্রামটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। গ্রামবাসীর চলাচলের প্রধান পথ বানিয়াগাতি-পিপুলবাড়ীয়া সড়ক। এই পথ ধরে সোনামুখী ইউনিয়ন হয়ে ধুনট উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বানিয়াগাতি-পিপুলবাড়ীয়া সড়ক দিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ধুনট উপজেলা শহরে যেতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট। কিন্তু বলারবাড়ী গ্রামের দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কারণে ওই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। বর্ষায় সময় আরও বেড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হয়।
দুর্ভোগ নিয়ে আক্ষেপ করে বলারবাড়ী গ্রামের কয়েকজন জানালেন, বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি কাদা ও পানিতে ডুবে যায়। তখন যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমেও গর্ত ও খানাখন্দে ভরা রাস্তাটিতে ভ্যান ও অটোরিকশা চলাচল করতে পারে না। ফলে বলারবাড়ী থেকে বানিয়াগাতি পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়িই হয়ে ওঠে প্রধান বাহন।
তারা জানালেন, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন অসুস্থ ও জরুরি রোগীরা। বেহাল রাস্তার কারণে অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, অনেক সময় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলও গ্রামে ঢুকতে পারে না। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে ঘোড়ার গাড়িতে করে কিংবা কাঁধে তুলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মূল সড়কে নিতে হয়। কৃষকদেরও উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়।
গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কাদা-পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বর্ষাকালে পোশাক ও বই-খাতা নিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বলারবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মোমিন জানিয়েছেন, একটি ভালো রাস্তা এখন গ্রামবাসীর কাছে কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন। একটি রাস্তার অভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও দৈনন্দিন যোগাযোগসহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে গ্রামটি।
গ্রামের মানুষ ও পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজ করছেন ঘোড়ার গাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, গ্রামের অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করেন। অনেকে ঘোড়ার গাড়িতে পণ্য আনা-নেওয়া করেন। বর্ষায় পানির কারণে গ্রামের ভেতরে যাওয়া যায় না। পানি কমে গেলে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও কাদা থাকলে গাড়ি টানতে ঘোড়ারও কষ্ট হয়।
সড়কের বেহাল অবস্থা
১১ জুলাই ২০২৬
গোপালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই রাস্তার কোনো বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে এলাকাবাসীকে এ পথেই চলাচল করতে হয়। একটি পাকা সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিলের ওপর প্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে গ্রামবাসী মুক্তি পাবেন।
ধুনট উপজেলা প্রকৌশলী বখতিয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বলারবাড়ী গ্রামের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। বিল এলাকা হওয়ায় সেখানে সাবমারসিবল সড়ক নির্মাণ করা যেতে পারে।
তিনি আরও জানালেন, সম্প্রতি কয়েকটি জেলার সড়ক উন্নয়নে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় বলারবাড়ীর জন্য একটি সেতুসহ সড়ক নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আগামী একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা হবে। ততদিন গ্রামবাসীকে আরও কিছুদিন দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে।





