হাওর-পাহাড়ে জলাতঙ্ক ঝুঁকি

ছবি: আগামীর সময়
দেশজুড়ে হাম আক্রান্তে শিশুমৃত্যুর আহাজারি চলছে। এরই মধ্যে হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী রেবিস ভ্যাকসিনের সংকট। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে প্রতিকার পাচ্ছেন না বর্ষায় বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা। ভ্যাকসিনের সামান্য মজুদ থাকলেও হাসপাতালে দায়িত্বরতদের বিরুদ্ধে বিনামূল্যে না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হবিগঞ্জের সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলতি বছর রেবিস ভ্যাকসিনের চাহিদা ১০ হাজার ৬৮০ ভায়াল বা ৪২ হাজার ৭২০ ডোজ। কাগজেপত্রে মাত্র ২২৭ ভায়াল বা ৯০৪ ডোজ মজুদ থাকলেও বাস্তবে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। বাইরে থেকে কিনে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়।
জেলা শহরে চৌধুরীবাজারের গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও গণমাধ্যমকর্মী নূর ইসলামের ছেলে আল নাহিয়ানকে গত সপ্তাহে একটি বেওয়ারিশ বিড়াল কামড় দিলে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের দায়িত্বরতরা তাকে জানান, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী রেবিস ভ্যাকসিন নেই। পরে বাইরে থেকে ৫০০ টাকায় কিনে এনে দেন নূর। গত সোমবার অনন্তপুর এলাকার শিক্ষক শামীম আহমদ তার ভাতিজা সাজু মিয়া এবং মঙ্গলবার কলেজ কোয়ার্টারের সাইফুর রহমান রিমন তার চাচাতো ভাই শাফকাত আহমেদকে ভ্যাকসিন দিতে সদর হাসপাতালে একই ঘটনা ঘটে।
শামীম আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত দুজন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে প্রথমে ইশারায় কথা বলেন। পরে জানান, বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। বাধ্য হয়ে ফার্মেসি থেকে ৫০০ টাকায় কিনে এনে দিয়েছি। একইভাবে রিমন ও শামীমও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
হাসপাতালের সুপার ডা. আমিনুল হক সরকারকে ঘটনা জানালে তিনি দাবি করেন, ভ্যাকসিন বহির্বিভাগ থেকে বিতরণ করা হয়। তাই জরুরি বিভাগে গিয়ে পাওয়া যায় না। তবে লোকজনকে ফেরত যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে জরুরি বিভাগেও নিয়ে সংরক্ষণের জন্য বলে দেব।
জেলার নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলতি বছর জলাতঙ্ক প্রতিরোধী রেবিস ভ্যাকসিনের চাহিদা ১২০০ ভায়াল। সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের কাগজপত্রে সেখানে ১০ ভায়াল থাকার তথ্য থাকলেও বাস্তবে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার কামালপুর গ্রামের মিঠু আহমেদ সম্প্রতি এ নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তার ভাষ্য, কামালপুর গ্রামে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষদিকেই চারদিকে পানি আসে। হাওরের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের কামড়ায়। কিন্তু গরিব কৃষকরা হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। কয়েকজনের ক্ষেত্রে আমি নিজে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম। নবীগঞ্জ উপাজেলার বেশিরভাগজুড়েই হাওর এবং একই অবস্থা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ জানান, গত এক বছর ধরেই হাসপাতালে ভ্যাকসিনের মজুদ নেই। সম্প্রতি আবারও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
জেলায় সবচেয়ে বেশি টিকার চাহিদা পাহাড় ও চা-বাগানঘেরা চুনারুঘাট উপজেলায়; ২৮৮০ ভায়াল। সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের হিসাবে মজুদ আছে মাত্র ১৩২ ভায়াল। কোনো কোনো দিন ৪/৫ জন করেও কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হোসেন।
আক্রান্তদের বেশিরভাগই চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের শিশু। এ ছাড়া বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ২০ ভায়াল করে, মাধবপুরে ১০, বাহুবলে ২৫ এবং লাখাই উপজেলায় ১০ ভায়াল টিকা রয়েছে। অথচ প্রত্যেকটিতে চাহিদা কমপক্ষে ৪০০ থেকে দেড় হাজার ভায়াল। জেলার বাকি দুই উপজেলা হবিগঞ্জ সদর ও শায়েস্তাগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল।
বাজারে ইনসেপ্টা ও পপুলার কোম্পানির ভ্যাকসিনের দাম ৫০০ টাকা। আর গুরুতর আক্রান্ত রোগীকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি ইনজেকশন রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিনের (আরআইজি) মূল্য এক হাজার টাকা। যার একটিও জেলার কোনো হাসপাতালে মজুদ নেই।
হাওরাঞ্চলে গরম ও বর্ষাকালে কুকুরের আচরণ বেশি অস্থির হয়ে পড়ে। এর প্রমাণ গত বছরের শুরুতে হবিগঞ্জ শহরে এক পাগলা কুকুরের কামড়ে দেড় শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হলে ২০ জনকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একইভাবে মাধবপুর উপজেলায়ও একই দিনে ১৫ জন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হন। জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায়ই পাগলা কুকুর অস্থির হয়ে উঠে মানুষকে কামড়ানোর খবর পাওয়া যায়।
বানিয়াচং উপজেলার গ্যানিংগঞ্জ বাজারের ওষুধের দোকানী, যুবায়ের আহমেদের ভাষ্য, প্রায়ই হাসপাতালে রোগী রেখে স্বজনরা বাজারে ভ্যাকসিন নিতে আসেন। প্রতিবছর শতাধিক লোক তার দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনে হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োগ করিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি বাহার উদ্দিন উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন, বর্ষাকালে হাওরের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো জনবহুল এলাকায় ঢুকে পড়ে শিশুদের কামড়ায়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে স্বল্প আয়ের লোকজন বিপাকে পড়ছে। অনেক গরিব রোগী টাকার অভাবে ভ্যাকসিন কিনতে পারছে না। তাদের জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঝুঁঁকিতে পড়তে হয়।
তার ভাষ্য, ভাদ্র মাসে কুকুরের উপদ্রব আরও বাড়বে। এর আগেই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আঞ্চলিকভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
ভ্যাকসিনের সংকটের ব্যাপারে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাসের ভাষ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দীর্ঘদিন ধরে জেলাগুলোতে ভ্যাকসনি সরবরাহ করা হচ্ছে না। এজন্য আমরা উপজেলা হাসপাতালে পাঠাতে পারছি না। এই সংকট নিয়ে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে আলোচনা হয়েছে। ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য উপজেলা প্রশাসনের উন্নয়ন খাত থেকে বরাদ্দ নিয়ে কিছু ভ্যাকসিন সরাসরি ক্রয়ের চেষ্টা চলছে। তবে ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালকে তাদের মত করে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হবে।
হবিগঞ্জের বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মুকুট রায়ের সঙ্গে জলাতঙ্ক বিষয়ে কথা হয়েছে আগামীর সময়ের।
তার ভাষ্য, জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বাদুড়সহ সংক্রমিত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত প্রাণীর লালা খোলা ক্ষতস্থান, চোখ, মুখ বা নাকের ঝিল্লিতে লাগলেও সংক্রমণ হতে পারে।
ভাইরাস শরীরে ঢুকে ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত স্থানে সঙ্গে সঙ্গে কমপক্ষে ১৫ মিনিট সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুতে হবে। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে রেবিস ভ্যাকসিন নিতে হবে। গুরুতর কামড় বা ক্ষত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) নিতে হবে। লক্ষণ দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা যাবে না; লক্ষণ শুরু হলে রোগটি প্রাণঘাতী। কামড়ানো প্রাণীকে সম্ভব হলে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং বেওয়ারিশ প্রাণী হলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।




