বরিশাল বিভাগে ৬ মাসে দেড় হাজার মাদক মামলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশালে ছোঁয়াচে রোগের মতো প্রাদুর্ভাব ঘটেছে মাদকের। বিভাগ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নেশাজাতীয় দ্রব্যের আসক্তি ও কারবার। অধিকাংশ ঘটনা নথির বাইরে থাকলেও লাফিয়ে বাড়ছে মামলা। ছয় মাসেই থানায় লিখিত অভিযোগ পড়েছে দেড় সহস্রাধিক। এই সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও বাড়ছে মাদকাসক্তের ভিড়। প্রতিদিন গড়ে পাঁচজন করে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বরিশাল জেলায় ৩৮৪টি, পটুয়াখালীতে ২৯৯, ভোলায় ৩৪৮, পিরোজপুরে ২৭৩, বরগুনায় ১২৩ ও ঝালকাঠিতে ১৪৮টি মাদক মামলা হয়েছে। এতে মোট মামলা দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৭৫টিতে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ে বরিশালে ২৩০টি, পটুয়াখালীতে ২২১, ভোলায় ৯৬, পিরোজপুরে ১৬৪, বরগুনায় ১১০ ও ঝালকাঠিতে ৫৬টি মামলা হয়েছিল। এই ৮৭৭ মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোলায়, যেখানে গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ৯৬টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৮টিতে। আর বিভাগে গত বছরের তুলনায় মামলা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এর েচয়েও উদ্বেগ্নজনক তথ্য হলো, অধিকাংশ আসামি তরুণ।
‘২০২৫ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৯০৭টি মাদক মামলা হয়েছে। এক বছরে সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৪১ জন’— তথ্য দিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল জেলা কার্যালয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বরিশাল জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক তানভীর হোসেন খান বলছিলেন, ‘মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই তরুণ। তা ছাড়া নারীদের সম্পৃক্ততাও দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সেসব বিষয়ে লক্ষ্য রেখেই সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছি।’
বরিশালের দি নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মর্তুজা জুয়েল বললেন, ‘এই কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে পাঁচজন নতুন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য আসেন। যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই তরুণ। ১৬ থেকে ৩৫ বছরের বয়সী বেশি। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শুরু থেকেই এসব তরুণের দিকে খেয়াল রাখা হতো, তাহলে মাদকের সঙ্গে হয়তো সম্পৃক্ত হতে পারত না তারা। এমন এমন পরিবারের সন্তানরা মাদকে জড়িয়ে পড়েছে, তা অবাক করবে অনেককে। এখনো প্রতিদিন গড়ে শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন।’
‘পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের পাশাপাশি সঙ্গদোষও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে বন্ধুমহল, কারও ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা, আবার কেউ কৌতূহল থেকে মাদক নিচ্ছে। কারণ চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ করে পরিবারে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মাদকের কবল থেকে বাঁচাতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান জরুরি’— যোগ করলেন তিনি।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তপন কুমার সাহা বললেন, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা, একাকিত্ব ও সঙ্গদোষের কারণে অনেক তরুণ মাদকে ঝুঁকে পড়েন। একজন ব্যক্তি কেন মাদক নিতে শুরু করেছেন, তা চিহ্নিত করে সময়মতো কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও পরিবারের সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবারের উদাসীনতা ও সন্তানকে সঠিক গাইড করতে না পারায় সমস্যাগুলো দিন দিন বাড়ছে। পরিবারকে সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক জুলফিকার আলী হায়দারের ভাষ্য, ‘মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় নেই। আমরা বিভাগ জুড়ে মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। সেখানে আমাদের তথ্য দেওয়ার জন্য একটি হট লাইন নম্বরও দেওয়া হয়েছে। মাদকের গডফাদার থেকে শুরু করে মাদকসেবী পর্যন্ত যে চেইন রয়েছে, সেটি ধ্বংস করে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’



