বীরগঞ্জে প্রাণ হাতে নিয়ে পাঠ

ছবি: আগামীর সময়
যে শ্রেণিকক্ষে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা শিশুদের, সেই শ্রেণিকক্ষের ছাদে আটকে থাকে তাদের চোখ। কখন খসে পড়ে পলেস্তারা, কখন ভেঙে পড়ে ছাদ— এই আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন ক্লাস করতে হচ্ছে তাদের। অবশ্য ‘ঝুঁকি কমাতে’ ছাদের নিচে দেওয়া হয়েছে বাঁশের খুঁটি। কিন্তু তাতেও কাটেনি ভয়। বরং সেই ভয়েই সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চাইছেন না অনেক অভিভাবক।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের ২৪ নম্বর দক্ষিণ পাল্টাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের কয়েকটি শ্রেণিকক্ষের ছাদ ও দেয়ালে বড় বড় ফাটল। কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা, আবার কোথাও বেরিয়ে এসেছে মরিচা ধরা রড। দীর্ঘদিন বৃষ্টির পানি চুইয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ভবনের বিভিন্ন অংশ। দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েকটি স্থানে ছাদের নিচে বাঁশের খুঁটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে ঠেকনা। বিদ্যালয়ের প্রতিটি ভবনের বিভিন্ন অংশেই চিহ্ন রয়েছে ফাটল ও জরাজীর্ণতার। এরই মধ্যে একটি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সেখানেই ঝুঁকি নিয়ে চালাতে হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। যেকোনো সময় ছাদের পলেস্তারা বা কোনো অংশ খসে পড়তে পারে আশঙ্কা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি; জাতীয়করণ করা হয় ১৯৭৩ সালে। বর্তমান ভবনটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটির বড় ধরনের সংস্কার হয়নি ভবনটির।
প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিব জানালেন, প্রায় এক দশক ধরে নতুন ভবনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী বরাবরও পাঠানো হয়েছে আবেদন। শিক্ষা অফিসে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। সহকারী শিক্ষিকা মোছা. দুলালি বেগম বলছিলেন, ‘আমরা দোটানায় পড়ে আছি। ভয়ে পাঠদান করতে পারছি না, আবার পাঠদান বন্ধ রাখলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাবে। অনেক অভিভাবক ভয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।’
ছয় বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে আছেন সহকারী শিক্ষক হারুন অর রশীদ। তখন থেকেই ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে পড়াচ্ছেন বাচ্চাদের। দ্রুত বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করার দাবি তার।
বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেও। গত বছর এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১৩১ জন। নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি তো হয়নি বরং বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২৬ জনে। অথচ বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী থাকার অন্তত কথা দুই শতাধিক।
বিদ্যালয় কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেছেন, অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাওয়ায় নিজ উদ্যোগে ছাদের বিমে বাঁশ দিয়ে খুঁটি দিয়েছেন তিনি। এতে কিছু শিক্ষার্থী আবার স্কুলে আসছে। তবে এই ব্যবস্থা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় উল্লেখ করে দ্রুত বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শুধু অভিভাবক নয়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থীরাও। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে বলছিল, ‘বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে মাঝে মাঝে পলেস্তারা খসে আমাদের ওপর পড়ে। এ কারণে সবসময় আতঙ্কে থাকি; না জানি কখন ছাদ ভেঙে পড়ে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও রয়েছে এ নিয়ে উদ্বেগ। সেলিম রেজা নামের একজনের ভাষ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ছাদ ঠেকিয়ে ক্লাস চালানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে প্রতিদিনই দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে অভিভাবকদের। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সেথা রানীর কথায়ও প্রকাশ পায় একই আতঙ্ক।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি আগেই ঘোষণা করা হয়েছে পরিত্যক্ত। কিন্তু বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না থাকায় সুযোগ নেই পাঠদান বন্ধ করার। ফলে বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে চালাতে হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।
বীরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজিদা হক আগামীর সময়কে জানালেন, সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করে ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখা গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে নতুন ভবনের চাহিদাপত্র। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই উল্লেখ করে উপজেলা এলজিইডি কর্মকর্তা হুমায়ুন আহমেদও শোনালেন একই আশার বাণী।
নতুন ভবনের বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকা বিদ্যালয়টিতে আপাতত বাঁশের খুঁটিই হয়ে আছে ছাদ ঠেকানোর ভরসা। তবে এই সাময়িক ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, তা নিয়েই থেকে যাচ্ছে প্রশ্ন। অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবস্থা করা হোক একটি নিরাপদ বিকল্প শ্রেণিকক্ষের।



