শরণখোলা
ঋণের জালে বন্দি উপকূলের হাজারো জেলে-মহাজন
- চলতি মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ না পাওয়ায় লোকসানে বেশিরভাগ মহাজন
- ঋণের দায়ে জাল-ট্রলার বিক্রি করে মহাজন এখন শ্রমিক
- ভিটেবাড়ি বিক্রি করে এলাকাছাড়া অনেকেই
- প্রতিবছরই ভারি হচ্ছে ঋণের বোঝা
- নিষেধাজ্ঞায় বাড়ছে দুর্ভোগ

ছবি: আগামীর সময়
একসময় নিজের জাল ও ট্রলার ছিল সোহরাব তালুকদারের। নিজেই ছিলেন মহাজন। সাগরে ইলিশ আহরণ করে ভালোই চলছিল তার পাঁচ সদস্যের সংসার। তার ট্রলারে কর্মসংস্থান হয়েছিল আরও ৮ থেকে ১০ জন জেলের। কিন্তু একের পর এক লোকসানে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কম দামে বিক্রি করে দিতে হয় তার জাল ও ট্রলার। উপার্জনের শেষ সম্বল হারিয়ে মহাজন থেকে হয়েছেন শ্রমিক। এখন অন্যের ট্রলারে জেলে শ্রমিক হিসেবে সাগরে যান তিনি। এখনো সাত লাখ টাকার ঋণের বোঝা মাথায় রয়েছে তার।
সোহরাবের মতো দুর্দশায় পড়েছেন শরণখোলার আরেক মৎস্য ব্যবসায়ী সোহাগ বয়াতী। একসময় তারও ছিল নিজস্ব জাল-ট্রলার। কিন্তু লোকসানের কারণে প্রায় ২০ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনিও। দেনা শোধ করতে বিক্রি করে দিতে হয় নিজের সেই জাল ও ট্রলারও। এখন অন্যের ট্রলারে সাগরে মাছ ধরতে যান শ্রমিক হিসেবে। তার মাথায়ও রয়ে গেছে পাঁচ লাখ টাকার ঋণ।
আরেক মৎস্য ব্যবসায়ী আমিনুর হাওলাদার। ঋণ পরিশোধ করতে ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন নিজের বসতবাড়ি। তাতেও শোধ হয়নি সম্পূর্ণ ঋণ। অবশিষ্ট দেনার চাপ সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তাকে।
সোহরাব, সোহাগ ও আমিনুরের মতো বাগেরহাটের শরণখোলাসহ উপকূলের হাজারো জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী এখন ঋণের জালে বন্দি। কেউ পেশা ছেড়েছেন, কেউ সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছেন। আবার কেউ দেনার দায়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। সাগরে মাছ ধরে ভাগের টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ঋণ শোধের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা, তা এখন অনেকের কাছে দেখা দিয়েছে দুঃস্বপ্ন হয়ে।
উপকূলের বিভিন্ন এলাকার জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন দুর্দশার চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছেন নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ে মৎস্য আহরণ ও চিংড়ি জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এ ছাড়া বার বার মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বন ও জলদস্যুদের উৎপাতের কারণে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে মৎস্য আহরণ। ফলে ঠিকমতো মাছ ধরতে না পারায় বেশিরভাগ জেলে ও মহাজন পড়ছেন আর্থিক সংকটে। সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে তাদের। সেই ঋণ শোধ করতে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সত্বেও সাগরে যেতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় বার বার লোকসানে পড়ে আরও ভারী হচ্ছে তাদের ঋণের বোঝা।
শরণখোলার চালরায়েন্দা গ্রামের জেলে শাহীন তালুকদার প্রায় ১৫ বছর ধরে অন্যের ট্রলারে শূন্য ভাগে সাগরে ইলিশ ধরছেন। তার জীবিকার প্রধান উৎস সাগরে মাছ ধরা। কিন্তু এবারের মৌসুমে তেমন মাছ ধরা পড়েনি তাদের জালে। মৌসুমের চার মাসে ভাগে পেয়েছেন মাত্র ৩২ হাজার টাকা। পাঁচ সদস্যের সংসারে এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবারের সারা বছরের খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন। গ্রামের সুদের কারবারিদের কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছেন এক লাখ টাকা। কিন্তু মাছ কম পাওয়ায় ঋণ শোধ করতে পারেননি তিনি।
শাহীন তালুকদারের মতো শরণখোলাসহ উপকূলে অনেক জেলেকেই বছরে পর বছর বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ঋণের বোঝা। তাদের কারও ঋণ এক লাখ টাকা, কারও দুই লাখ আবার কারো ৭-৮ লাখ টাকাও ঋণ রয়েছে। এ ছাড়া এমনও ট্রলার মালিক রয়েছেন, যার মাথায় ঋণ রয়েছে ৩০ লাখ টাকাও। সারা বছর সাগরে মাছ ধরেও কমছে না দেনার ভার। এ অবস্থায় সংসারের ব্যয় মেটাতে এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে জেলে ও ট্রলার মালিকদরে।
শরণখোলার রাজেশ্বর গ্রামের জেলে জামাল তালুকদার জানান, তার ঋণ রয়েছে এক লাখ টাকা। তাফালবাড়ী গ্রামের ওমর ফারুক জানান, তার ঋণ এক লাখ টাকা এবং তালতলী গ্রামের রফিকুল খান জানিয়েছেন, তার ঋণ রয়েছে দুই লাখ টাকা।
অপরদিকে, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার খাউলিয়া গ্রামের জেলে সজিব হাওলাদার এবং পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার তুষখালী গ্রামের জেলে আলামীন শিকদার জানালেন, শূন্য ভাগে মাছ ধরেন তার। মাছ পড়লে ভাগে যা পান তা দিয়েই সারা বছর চলে সংসার। আর মাছ না পেলে ধারদেনা ও ঋণ করে চলতে হয়। এবছর মৌসুম খুব খারাপ গেছে। যে কারণে তারা প্রত্যেকে এক লাখ, দেড় লাখ টাক করে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ কারণে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সাগর ও নদ-নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে এই নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে শ্রমিক।
যাদের এক দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলে চুলায় হাঁড়ি চড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে, তাদের জন্য টানা ২২ দিন কর্মহীন থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। সংসারের খাবার খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ঋণের কিস্তিতো আর থেমে থাকে না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে আরও বাড়ে তাদের দুশ্চিন্তা।
কর্মহীন জেলেদের কেউ মহাজনের জাল মেরামত করছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ খুঁজছেন। আবার কেউ ধারদেনা করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। যারা আগে থেকেই ঋণগ্রস্ত, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাগরে মাছ কম পাওয়া, ট্রলারের খরচ এবং সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। কমেছে আয়রোজগার। বেড়েছে দেনার পরিমাণ। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাছ ধরার মৌসুমে আয় কম হওয়ায় অনেকেই নিষেধাজ্ঞার আগেই ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সংকুচিত হয়ে গেছে ঋণ পরিশোধের পথও।
শুধু জেলে শ্রমিক নয়, লোকসানের চাপে রয়েছেন ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। মাছ ধরার জন্য একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি, খাবার, বরফসহ নানা খাতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু সাগরে মাছ না মিললে সেই খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে।
শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিক হালিম বয়াতী জানিয়েছেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে শেষ ট্রিপে তার ট্রলার সাগরে পাঠাতে খরচ হয়েছিল তিন লাখ টাকা। মাছ বিক্রি করে পেয়েছেন সাড়ে চার লাখ টাকা। ট্রলারে থাকা ১৮ জন জেলের প্রত্যেকে ভাগে পেয়েছেন তিন হাজার ২০০ টাকা করে। সব খরচ ও ভাগের টাকা দেওয়ার পর ট্রলারমালিক হিসেবে তিনি লাভের মুখ দেখেননি একটি টাকাও।
অপর ট্রলার মালিক বেলায়েত খান জানান, শেষ ট্রিপে তার বিনিয়োগ ছিল তিন লাখ টাকা। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় পুরো চালানই লোকসান হয়েছে তার। ট্রলার মালিক শহিদুল ইসলাম জানান, মৌসুমে তার বিনিয়োগ ছিল ৮ লাখ টাকা। কিন্তু লাভের মুখ দেখেননি। রফিকুল হাওলাদার জানালেন, তার ঋণ রয়েছে ৩০ লাখ টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলার মালিকরা জানালেন, একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে প্রতি ট্রিপে তিন থেকে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ না পেলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও ওঠে না। এভাবে বার বার লোকসান হলে কখনো আড়ৎদারদের কাছ থেকে আবার বিভিন্ন এনজিও থেকেও ঋণ নিয়ে পরবর্তীতে ট্রলার সাগরে পাঠাতে হয়। এরপরও মাছ না মিললে ঋণ শোধের জন্য জাল-ট্রলার, ভিটেবাড়ি বিক্রি করা ছাড়া অনেকের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
জেলে-মহাজনদের ভাষ্য, উপকূলের জেলেদের নানা সংকট মোকাবেলা করেই সাগরে মাছ ধরতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দস্যুতা, নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ের দাপট ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে মৌসুমের প্রায় তিন মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। নিরাপদে এবং সঠিক সময়ে মাছ ধরতে না পারায় আরও বেশি সংকটে পড়তে হয় জেলেদের। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তখন ধারদেনাই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ভরসা।
জেলেদের দুর্দশা কমাতে তারা মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যাপ্ত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সাগরে নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলার ও অবৈধ জালের ব্যবহার, ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করে মাছের প্রজনন ও প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।
শরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২২ দিনের নিষেধজ্ঞা চলমান রয়েছে। এই সময়ে বেকার হয়ে পড়া জেলেদের খাদ্য সহায়তার দেওয়া হবে। ২৫ কেজি করে চাল পাবেন নিবন্ধিত প্রত্যেক জেলে। তবে জেলেদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি উপর মহলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।





