আশ্রয়ণের ঘরে তালা, আঙ্গিনায় লতাপাতা-গোবর

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার খলিশাডহুরা এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প। ছবি: আগামীর সময়
প্রতিটি ঘরের সামনে গজিয়েছে ঘাস-লতাপাতা। দরজায় ঝুলছে তালা। কোনোটির আঙিনায় ময়লার স্তূপ, কোনোটিতে জমিয়ে রাখা গোবর। বছরদুয়েক ধরে এভাবেই পড়ে আছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার খলিশাডহুরা এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো। সরকার থেকে বরাদ্দ পেয়েও এসব ঘরে থাকছে না কেউ।
প্রকল্পের পাশেই বাড়ি বৃদ্ধ আব্দুল বারেকের। বললেন, ‘প্রথম প্রথম এক-দুইডা ঘরে লোকজন উঠছিল। এক বছর ধইরা তারাও চইলা গেছে গা। এহন বেকটি ঘর খালি পইরা রইছে তালা দেওয়া অবস্থায়। সুন্দর ঘরগুলা নষ্ট হয়ে যাইতেছে। অন্য মানুষজনরে থাকতে দিলে ঘরগুলা তাও ভাল থাকত।’
সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর কর্মসূচি। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ছিল এই প্রকল্প। এর আওতায় খলিশাডহুরা এলাকায় তোলা হয় ১৭টি ঘর। হস্তান্তরও হয় দলিল। প্রতিটি ঘরের পেছনে সরকার থেকে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সাটুরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বরাইদ ইউনিয়নে। প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, ১৭টি ঘরই তালাবদ্ধ। কোনো ঘরের সামনে মাটির স্তূপ, কোনোটির সামনে এলাকার মানুষ রেখেছে গোবর। ঘরের চারপাশ ঘিরে ধরেছে জঙ্গল, ফাটল ধরেছে দেয়ালে।
খলিশাডহুরা এলাকার মোছা. শাহানাজ বললেন, ‘মানুষ না থাকায় ঘরের বারান্দায় এলাকার লোকজন ট্রাক্টর, মাটি, গোবরসহ নানা কিছু রেখেছে। ঘরগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, প্রথম প্রথম কয়েকজন এসে কয়েক মাস পর পর ঘর পরিষ্কার করত। কিন্তু গত প্রায় ২ বছর ধরে তাও আসে না।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকা। তাতে দেখা গেছে, বরাদ্দ পাওয়া মানুষগুলো প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে বালিয়াটি ইউনিয়নের বালিয়াটি, হাজীপুর ও খলিলাবাদ গ্রামের বাসিন্দা।
বরাদ্দের ঘরে সেসময় উঠেছিলেন পাপন খান। কয়েক মাস পরেই ফিরে গেছেন আগের অবস্থান হাজীপুর গ্রামে। সেখানে তার স্বর্ণের ছাই কেনাবেচার ব্যবসা।
‘প্রতিদিন আশ্রয়ণে থেকে ব্যবসার জন্য বের হলে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়। যাতায়াতেও সময় অপচয় ও ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে তালা মেরে চলে এসেছি’- ভাষ্য তার। পাপনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অন্য বাসিন্দাদেরও প্রকল্পের ঘর ছেড়ে আসার কারণ- কাজের জায়গা থেকে দূরত্ব।
‘অনেকে জমিসহ এসব ঘর বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়ার পর তা বিক্রি করতে না পেরে ঘর ফেলে রেখেছে। এলাকার অনেক ভূমিহীন লোক আছে। তাদের ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া জন্য কয়েকবার ইউএনওর কাছে লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি’- অভিযোগ স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রমজান আলীর।
প্রকল্পটি সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন বলে জানালেন সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান মোল্লাহ। ‘প্রকল্পের ১৭টি ঘরেই কেউ থাকে না। বিষয়টি ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি। তিনি ওই এলাকায় থাকার জন্য আগ্রহী কেউ থাকলে তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বলেছেন’- বললেন তিনি।
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামের কথা, ‘ঘরগুলোতে বরাদ্দপ্রাপ্তরা যারা থাকছেন না, তাদের দলিল বাতিল না করলে তো অন্যদের বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব না। বরাদ্দপ্রাপ্তদের নোটিস করব, কেন তারা থাকছেন না। এখন ওখানকার কোনো অসহায় মানুষ থাকলে আমরা তাদের আপাতত থাকতে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি।’





