চণ্ডীছড়ার সবুজে বাদামি খরগোশ

টিলার ঢালে সারি সারি চা-গাছ, চারপাশে সবুজ। এরই মধ্যে শুকনো ঘাসের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে হঠাৎ দেখা দেয় ধূসর-বাদামি এক বুনো খরগোশ। কান খাড়া করে চারপাশ দেখে মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় ঝোপের আড়ালে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চণ্ডীছড়া চা-বাগানে সম্প্রতি দেখা মেলে দুর্লভ এই প্রাণীর। একসময় সাতছড়ির পাহাড় ও চা-বাগানে নিয়মিত দেখা গেলেও এখন বুনো খরগোশের দেখা পাওয়া কঠিন। শিকার ও আবাসস্থল সংকোচনে হারিয়ে যেতে বসা এই প্রাণীর উপস্থিতি তাই নতুন করে সামনে এনেছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রশ্ন।
চলতি সপ্তাহে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক বশির আহমেদ প্রাণীটির একটি ভিডিও ধারণ করেন। এর আগে ২০২৫ সালে একই উপজেলার দেউন্দি চা-বাগানে আরেকটি খরগোশের ছবি তুলেছিলেন শৌখিন আলোকচিত্রী শাহেদ আহমেদ।
সিলেট বিভাগের পাহাড়ি শুকনো বন, বনসংলগ্ন এলাকা ও চা-বাগানে দেখা মেলে খরগোশের। চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি বনেও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের আশপাশের এলাকাও প্রাণীটির সম্ভাব্য আবাসস্থলের মধ্যে পড়ে। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ হবিগঞ্জ রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেনের ভাষায়, বুনো খরগোশ সাধারণত পাহাড়ি শুকনো বন ও বনের প্রান্তে বসবাস করে। একা কিংবা জোড়ায় দেখা যায় এদের। তবে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে চা-বাগানেই প্রাণীটিকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে দেখা গেছে।
চণ্ডীছড়া চা-বাগানের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী জানালেন, ছোটবেলায় সাতছড়ির পাহাড় ও চা-বাগানে অসংখ্য বুনো খরগোশ দেখেছেন তিনি। কিন্তু এখন প্রাণীটির দেখা মেলে না বললেই চলে। তার ধারণা, শিকার, বনভূমির ঘনত্ব কমে যাওয়া ও অন্যান্য কারণে প্রাণীটির সংখ্যা কমেছে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামের সঙ্গে মিল থাকলেও দেশি বুনো খরগোশ আর পরিচিত গৃহপালিত খরগোশের জীবনযাপনে পার্থক্য রয়েছে। এটি মূলত দ্রুতগতির বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী। অনেকে একে উত্তর আমেরিকার ইস্টার্ন কটনটেইল খরগোশের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুই প্রজাতির চেহারায় পার্থক্য রয়েছে। দেশি বুনো খরগোশের লেজ ছোট ও চ্যাপ্টা; ওপরের অংশ কালো এবং নিচের অংশ সাদা।
দেশি বুনো খরগোশের শরীরের ধূসর-বাদামি রঙ শুকনো ঘাস ও মাটির সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। বুক, পেট ও শরীরের নিচের অংশ সাদা। ঘাড়ে কালচে দাগ থাকায় প্রাণীটি কালোগ্রীব নামেও পরিচিত। আলোকচিত্রী শাহেদ আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর দেহের দৈর্ঘ্য ৪০-৫৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২-৩ কেজি। লম্বা কান ও পেছনের শক্তিশালী পা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দিনের বেলায় ঘাসের মধ্যে অগভীর গর্তের মতো জায়গায় শরীর গুটিয়ে লুকিয়ে থাকে প্রাণীটি। ভোর ও সন্ধ্যায় খাবারের সন্ধানে বের হয়। ঘাস, লতাপাতা ও অন্যান্য উদ্ভিদ খেয়ে জীবন ধারণ করে। বিপদের আভাস পেলেই দ্রুতগতিতে জিগজ্যাগ পথে দৌড়ে পালায়। এই আকস্মিক গতি ও ছদ্মবেশের কারণে খোলা জায়গায়ও একে শনাক্ত করা কঠিন।
প্রজননের ক্ষেত্রে এদের নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম নেই; সারা বছরই প্রজনন করতে পারে। সাধারণত একবারে এক থেকে চারটি বাচ্চা জন্ম দেয়। বাচ্চারা চোখ খোলা ও শরীরে লোম নিয়ে জন্মায় এবং প্রায় এক মাস বয়সে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এদের গড় আয়ুষ্কাল পাঁচ থেকে ছয় বছর।



