দুর্ভোগের বর্ষায় বিলপাড়ে হাসি ফোটাচ্ছে শাপলা

কালীগঞ্জের বিলপাড়ে শাপলা তোলায় ব্যস্ত স্থানীয়রা। ছবি: আগামীর সময়
দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের কাছে বর্ষা যেন দুর্ভোগের আরেক নাম। তবে গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিলপাড়ের মানুষের ঘরে বর্ষা আনে রোজগার। এর মাধ্যম, জাতীয় ফুল শাপলা।
সেখানকার বেলাই ও ভাটিরা বিলসহ বিস্তীর্ণ জলাভূমি বর্ষায় ভরে ওঠে শাপলা ফুলে। বৈরী আবহাওয়ায় দিনের শুরুতেই বিলপাড়ে দেখা যায় কর্মব্যস্ততা। কেউ ডিঙ্গি নৌকায়, কেউ তালগাছের তৈরি কোন্দায় চড়ে ভোরেই লেগে যান শাপলা সংগ্রহে। সেসব স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে ঘরে আনেন রোজগার।
বেলাই বিলপাড়ের মো. ইকবাল হোসেন (৩৯) প্রতিদিন ভোরে নাস্তা সঙ্গে নিয়েই বেরিয়ে পড়েন শাপলা তুলতে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন অনেক আগেই। পড়াশোনা শেষ করেও জোটেনি স্থায়ী চাকরি। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমিতে শুকনো মৌসুমে চাষাবাদ আর বর্ষায় শাপলা বিক্রি করেই চলে তার সংসার।
একই গ্রামের মো. শরৎ আলী (৬৯) অন্যান্য সময় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ করেন। বর্ষা এলেই বদলে ফেলেন পেশা। ‘সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিলে শাপলা তুলি। প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকার শাপলা বিক্রি করি’- বলছিলেন তিনি।
‘বর্ষায় আমগো কোনো কাম-কাইজ থাহে না। বিলের হাবলা (শাপলা) বেইচ্চা যেই টেহা পাই, হেইডা দিয়া কোনো রহমে সংসার চালাই। কিন্তু আগের মতো এখন আর হাবলা ফোডে না। মানুষ বাড়ছে, সবাই হাবলা তোলে। তাই আগের চেয়ে হাবলাও কইমা (কমে) গেছে’- বললেন বিলপাড়ের মো. আজহার মোল্লা।
কথা হলো জমির উদ্দিন নামে আরেকজনের সঙ্গে। তিনি ঢাকার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করেছেন। প্রতিদিন প্রায় ১০০ আটি শাপলা সরবরাহ করেন। দৈনিক আয় হয় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তার কথা, ‘এত শাপলা সংগ্রহ করা সহজ না। এর পেছনে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম।’
বিলপাড়ের এমন প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার বছরের এই সময়ে শাপলার ওপর নির্ভর করেই সংসার চালায়। তাদের তোলা শাপলা পৌঁছে যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে, নানাজনের খাবারের পাতে।
উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের জয়রামবের গ্রামের ফুলরানী গমেজ (৬১) মেয়ের জন্য শাপলা নিতে এসেছেন সেখানে। ‘আমার মেয়ে ঢাকায় থাকে। ও শাপলার তরকারি খুব পছন্দ করে। তাই ওর জন্য কিছু শাপলা নিয়ে যাচ্ছি’- বললেন তিনি।
‘একসময় যে শাপলা বিলেই পচে নষ্ট হতো, আজ সেটিই মানুষের খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে’- মনে করেন স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি অ্যাড. মো. আতিকুর রহমান ভূঞা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী জানালেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবছর শতাধিক কৃষক প্রায় ১০০ টন শাপলা সংগ্রহ করেন। চাহিদা বাড়ায় শাপলা এখন একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বললেন, ‘বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান অনেকটাই কমে যায়। তখন নতুন মাছের পাশাপাশি বিলের শাপলাই অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে জিইয়ে রাখে। তবে অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে জাতীয় ফুলের বংশবিস্তার যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’





