পার্কিং সংকটে সড়ক দখল বিপর্যস্ত রাজশাহী
- অনুমোদিত পার্কিংয়ের জায়গা অনেক মালিক পরে ভাড়া দিয়ে দেন
- পার্কিং সংকটের কারণে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে
- পার্কিংয়ের জায়গা উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা নেই। তাই সড়কের পাশেই দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে গাড়ি। কোথাও দখল হচ্ছে ফুটপাত। কোথাও পার্ক করা যানবাহনে সংকুচিত হয়ে আসছে সড়ক। এতে যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে রাজশাহী নগরীর ব্যস্ত এলাকাগুলো। ভোগান্তিতে পড়ছেন চালক ও পথচারীরা। বাড়ছে সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকিও।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পার্কিংয়ের জায়গা উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। অন্যদিকে, আধুনিক পার্কিং সুবিধা গড়ে তোলার জন্য সম্ভাব্য স্থান খুঁজছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বাণিজ্যিক এলাকা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে পার্কিং সংকট সবচেয়ে বেশি। সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আরডিএ মার্কেট, আলুপট্টি মোড়, লক্ষ্মীপুর, তালাইমারী, রেলগেট, সোনাদীঘি মোড় ও রানীবাজার এলাকায় এ সমস্যা প্রকট। এসব এলাকায় মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাস নিয়মিত সড়কের পাশে কিংবা ফুটপাতের ওপর রাখা হচ্ছে। কোথাও দখল হয়ে থাকছে সড়কের একাংশও। ফলে কমে যাচ্ছে যান চলাচলের জায়গা। পথচারীদেরও চলতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে।
রাহুল নামে এক মোটরসাইকেলচালক বললেন, বাজারে কেনাকাটা করতে এসে নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া কঠিন। তাই অনেক সময় সড়কে বা রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল রাখতে হয়। পথচারী ইমদাদুল হক সোহাগের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বললেন, সড়কের পাশে যানবাহন পার্ক করে রাখায় হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে। বাজার ও অন্যান্য জনসমাগম এলাকায় পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা থাকা প্রয়োজন।
পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে অন্য কাজে ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট। তিনি বললেন, কিছু ভবনের অনুমোদিত নকশায় পার্কিংয়ের জায়গা রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে মালিকরা সেই জায়গা ভাড়া দিয়েছেন কিংবা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছেন। এ পরিস্থিতিতে পার্কিংয়ের জায়গা পুনরুদ্ধারে ভবন মালিকদের নির্দেশ দিয়েছে আরডিএ। পার্কিং সুবিধা ছাড়া নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনও বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
নগরীর আলুপট্টি মোড়ের সাততলা এএইচ টাওয়ারের একটি উদাহরণ। ভবনটিতে ১৩টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা গাড়ি রাখার কাজে ব্যবহার না করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবনটিতে আসা লোকজনকে বাইরে সড়কের পাশে গাড়ি রাখতে হচ্ছে।
সাহেববাজার জিরো পয়েন্টের কাছে অস্থায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে আরডিএর। এজন্য সাহেব বাজার বড় মসজিদের সামনের একটি খোলা জায়গায় ব্যবসা পরিচালনাকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া নগরীর আলুপট্টি এলাকায় অবস্থিত ঢাকা ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের সামনের এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দখল হয়ে থাকা জায়গা পরিষ্কার করে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরডিএর পরিকল্পনায় নিচতলায় বড় পরিসরে পার্কিং সুবিধা রাখার বিষয়টিও রয়েছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ।
এদিকে আধুনিক পার্কিং সুবিধা গড়ে তুলতে সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। সংস্থাটির প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেছেন, গাড়ি ওঠানো-নামানোর জন্য লিফট ব্যবহার করে পরিকল্পনা রয়েছে আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯টি। নিবন্ধিত অটোরিকশা ৮ হাজার ৯৭০টি। দুই শ্রেণির যানবাহন মিলিয়ে নিবন্ধিত মোট সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৯। এ ছাড়া নিবন্ধিত গাড়ির বাইরেও কয়েক হাজার অবৈধ গাড়ি রাজশাহী শহরে চলাচল করে।
বিপুলসংখ্যক এই যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না থাকায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের পার্কিংজনিত সমস্যা।
পার্কিং সংকটের কারণে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) নুর আলম সিদ্দিকী বললেন, পার্কিংয়ের জায়গার অভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ছে। কাউকে সড়কে গাড়ি রাখতে নিষেধ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, ‘গাড়ি কোথায় রাখব?’
এভাবে সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছে জানিয়ে স্বেচ্ছায় ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করা সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু বললেন, সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সরাসরি মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশিংয়ের চেয়ে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।



