চড়ের জবাবে শিক্ষিকাকে বিএনপি নেতার জুতা পেটা

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিএনপি নেতাকর্মী ও শিক্ষকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে কলেজের অধ্যক্ষ, নারী শিক্ষক এবং বিএনপি নেতাসহ অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে অধ্যক্ষের কক্ষে ও কলেজ চত্বরে ঘটেছে এ ঘটনা। রীতিমতো ভাইরাল শিক্ষিকা ও বিএনপি নেতার মারামারির একটি ভিডিও।
মারামারিতে আহত হয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম, উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী এবং কলেজটির দুই কর্মচারী। তাদের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক এবং নারী শিক্ষিকা হীরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার সময় কলেজটিতে চলছিল ডিগ্রির পরীক্ষা। ১৪৪ ধারা জারি ছিল কলেজ চত্বর ও এর আশেপাশের এলাকায়। মারামারির পর কলেজের অধ্যক্ষ ও অফিসকক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে পুরো কলেজ চত্বরে। পরীক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েকজন শিক্ষক, পরীক্ষার্থী ও হামলার শিকার শিক্ষকদের অনেকে প্রাণভয়ে কলেজ থেকে পালিয়ে যান।
ঘটনার বর্ণনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। বাগবিতণ্ডায় জড়ান অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে। ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে চড় দেন কলেজটির প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই শিক্ষিকাকে জুতা দিয়ে পেটাতে থাকেন ওই বিএনপি নেতা। অধ্যক্ষের কক্ষের বাইরে এসেও মারামারি করেন তারা। এক পর্যায়ে বিএনপির ওই নেতাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে দেখা গেছে। পরে উপস্থিত বিএনপির অন্য নেতাকর্মীরাও জড়ান সংঘর্ষে। ব্যাপক ভাঙচুর চালান কলেজের অফিসকক্ষে।
আহত শিক্ষকদের অভিযোগ, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ব্রহ্মপুর গ্রামের বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আফাজ আলী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদ আলী, ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, ৪নং ওয়ার্ড দাওকান্দি বিএনপির সভাপতি এজদার আলী, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি রুস্তম আলী, ছাত্রদল নেতা জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় ও ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী কলেজ ক্যাম্পাসে এসে হামলা চালায়। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রথমে কলেজের নারী শিক্ষক হীরা বিএনপি নেতা আকবর আলীর ওপর হামলা করেন। এর সূত্র ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কাছে বিভিন্ন সময় চাঁদা দাবি করছিল বিএনপির কয়েকটি গ্রুপ। তিনি তাদের কাউকে চেনেন না।
শিক্ষিকা আলেয়া খাতুন হীরার অভিযোগ, বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে প্রায় কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতেন। ‘আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসতেন। অধ্যক্ষ মহোদয় নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই কোনো পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না, এটাই অপরাধ ছিল তার। আর একজন সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষের পাশে থাকাটাই হয়েছে আমার অপরাধ’, যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপি নেতা আকবর আলীর ভাষ্য, ‘এই কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কলেজের জমি, গাছপালা বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন। সেই হিসাব চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের হিসাব দেয়নি, উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়েছে। ঘটনার দিন কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন প্রথমে আমাদের ওপর হামলা করে এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে চড়-থাপ্পড় মারেন। ফলে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেছেন এবং অফিস কক্ষ অফিস ভাঙচুর করেছেন।’
হামলা, ভাঙচুরের সময় অধ্যক্ষের কক্ষে উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন আরও পুলিশ সদস্য। অভিযোগ উঠেছে, তাদের উপস্থিতিতে মারামারির ঘটনা ঘটনা ঘটলেও প্রথমে নির্বিকার ছিলেন তারা।
অসহায়ত্বের সুর এই পুলিশ কর্মকর্তার মুখে, ‘বর্তমানে পুলিশ সদস্যরা কতটা অসহায় ও নিরুপায় তা আর বলার অবকাশ রাখে না’। তিনি বললেন, ‘পরীক্ষা চলাকালীন দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কেন্দ্র হিসেবে ও আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে এমন খবর পেয়ে কলেজে গিয়ে শিক্ষক ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলে তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের বাধার মুখেও কিছু লোকজন কলেজে প্রবেশ করে হামলা-ভাঙচুর চালায়।’ লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

