শ্যামনগর
১৫ দিন ধরে হাঁটু পানিতে ডুবে আছে গ্রাম

পানিতে ডুবে আছে বুড়িগোয়ালিনর আবাদচন্ডিপুর গ্রাম, ছবি: আগামীর সময়
প্রায় ১৫ দিন ধরে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও পানির মধ্যে সড়কের অস্তিত্বই বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ির উঠানেও থইথই পানি। পানিতে ডুবে আছে এলাকার অধিকাংশ কবর। এ পরিস্থিতিতে ঘর থেকে বের হওয়াই দুর্ভোগ স্থানীয়দের। এ ঘটনা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আবাদচন্ডিপুর গ্রামে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, উপজেলার আবাদচণ্ডিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩৭ নম্বর আবাদচণ্ডিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা থেকে মির্জাপাড়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক ও গ্রামের পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ির চিত্র এমনই। জলাবদ্ধতায় সড়কটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করে। কিন্তু বর্তমানে সড়কের ওপর হাঁটুসমান পানি থাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন। পানির কারণে বাড়ি থেকে বের হওয়া, বাজার করা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু চলাচলেই নয়, জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। বাড়ির উঠানে পানি জমে থাকায় রান্নাবান্না, খাবার পানি সংগ্রহ, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরিবারগুলো।
স্থানীয়দের আরও একটি বড় উদ্বেগ কবরস্থান নিয়ে। এলাকার প্রায় সব কবরই পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক কবরের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে স্বজনদের কবর জিয়ারত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাড়ির উঠানে পানি, রাস্তায় পানি, কবরস্থানেও পানি। এভাবে আর কতদিন চলতে হবে? এলাকায় এখন কেউ মারা গেলে তাকে দাফন করার জন্য কবর খুঁড়ব কোথায়- সেটাও জানি না।
মুজিবর সরদার, নজরুল ইসলাম বাবু, আজিবর রহমান ও সাইফুল ইসলামসহ কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে মৎস্যঘের গড়ে তোলা এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ জলাবদ্ধতার তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে অপরিকল্পিতভাবে ঘের করায় পানি বের হতে পারছে না বলে তাদের দাবি। সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকা জুড়ে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তাদের ভাষ্য, গত বছরগুলোতে এ ধরনের জলাবদ্ধতার সমস্যা তীব্র না থাকলেও চলতি বছর স্থানীয় প্রভাবশালীদের অপরিকল্পিতভাবে মৎস্যঘের করার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সড়কটি সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার দাবি জানানো হলেও এখনো এর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
মিজানুর রহমান, আবুল হোসেন তরফদার ও হাসানসহ স্থানীয়রা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে সড়কটি চলাচলের উপযোগীর পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রশ্ন, মানুষের চলাচলের রাস্তা, বসতভিটা এমনকি কবরস্থান- সবই যদি পানির নিচে থাকে, তাহলে এলাকার উন্নয়ন বলব কি করে?
আবাদচণ্ডিপুর গ্রামের গৃহবধূ নাছিমা বেগম বলেন, ঘরের চারপাশে পানি জমে থাকায় বাড়িতে রান্না করার পরিস্থিতি নেই। চুলার জায়গাটিও পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে দূরে অন্যের বাড়িতে গিয়ে রান্না করে সেই খাবার পরিবারের সদস্যদের খাওয়াতে হচ্ছে। এভাবে প্রতিদিন সংসার চালানো খুব কষ্টের হয়ে পড়েছে।
সিয়াম হোসেন, মাহিম, সুরাইয়া ও মাহিসহ স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বাড়ির উঠানে পানি, ঘরের মধ্যে পানি উঠবো উঠবো অবস্থা। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তা জুড়ে হাঁটুসমান পানি থাকায় প্রতিদিনই তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানির মধ্যে জামা-কাপড় ও বই-খাতা ভিজিয়ে স্কুলে যেতে হয়। পানি বেশি থাকলে অনেক সময় অভিভাবকরা তাদের স্কুলে পাঠাতেও চান না।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি মামলায় কয়েক দিন সাতক্ষীরা কারাগারে ছিলাম। সেসময় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা এখনো প্রত্যাহার হয়নি। এরপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি জেনে আমাকে ফোন করেছিলেন। পরে পরিষদের সচিব ও চৌকিদারকে সেখানে পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যেবক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে আমার একটি মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পের কারণে যদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আমি তা সমাধান করে দেওয়ার কথা জানিয়েছি। পানি নিষ্কাশনের জন্য আমার জায়গা দিয়ে প্রায় ২০০ ফুট পাইপ বসাতে হবে। পাইপ কেনা হয়েছে, আগামীকালই তা স্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




