১৪ কোটি টাকার পরিশোধনাগার এখন ময়লার ভাগাড়
- উদ্দেশ্য ছিল জৈব সার ও বায়োগ্যাস তৈরি
- ৫ বছরেও হয়নি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
- নষ্ট হচ্ছে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি

ছবি: আগামীর সময়
মাগুরায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্পটি পাঁচ বছর না পেরোতেই কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পরিবেশ রক্ষা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে নির্মিত প্রকল্পটি এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
দীর্ঘদিন প্রকল্পের মূল কার্যক্রম চালু না হওয়ায় পুরো এলাকায় জমে আছে পচা বর্জ্য ও আবর্জনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পনার অভাব, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণেই জনদুর্ভোগ ও পরিবেশ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোটি টাকার এ প্রকল্প।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাগুরা-যশোর মহাসড়কের পাশের শিমুলিয়া এলাকায় প্রায় তিন একর জমির ওপর নির্মিত প্রকল্পটির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের পুরো অংশেই জমে আছে আবর্জনা। জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য নির্মিত ছোট-বড় চেম্বারগুলোতেও ফেলা হচ্ছে ময়লা। প্রকল্পটির কোথাও নেই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যক্রম।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘তৃতীয় নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নতীকরণ (সেক্টর) প্রকল্প’-এর আওতায় বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হয় প্রকল্পটি।
২০২০ সালের আগস্টে কাজ শুরু হয়ে নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল শহরের বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা। সে অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় স্থাপন করা হয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও। তবে নির্মাণকাজ শেষ হলেও কখনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি, শুরু হয়নি পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি তৎকালীন সরকার। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে প্রকল্প এলাকাকে শুধু বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু করে পৌরসভা। প্রথমে প্রকল্পের ভেতরে বড় চেম্বারে ময়লা ফেলা হলেও বর্তমানে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। ফলে দুর্গন্ধে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের।
মাগুরা পৌরসভার একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক মেয়র জেলা আওয়ামী লীগ নেতা খুরশীদ হায়দার টুটুলের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয় প্রকল্পটির কাজ। তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে কথা বলেননি কেউ।
মাগুরা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘পৌরসভার গাড়িতে করে শহরের ময়লা এনে ফেলা হচ্ছে মহাসড়কের পাশেই। এত টাকা খরচ করে প্রকল্প করে যদি কোনো সুফলই না পাওয়া যায়, তাহলে লাভ কী! বড় বড় প্রকল্প এনে যদি মানুষের কোনো উপকার না হয়, তাহলে সেটা প্রকল্পের নামে বাণিজ্য ছাড়া আর কিছু নয়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমন অকেজো প্রকল্প করার চেয়ে সাধারণ ব্যবস্থাপনাই ভালো ছিল।’
শিমুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও মাছচাষি মুস্তাক হোসেনের ভাষ্য, ‘আমাদের বলা হয়েছিল এখানে গ্যাস ও জৈব সার তৈরি হবে, ময়লার কোনো প্রভাব আশপাশে থাকবে না। সেই বিশ্বাসে আমরা সহযোগিতা করেছি। কিন্তু এখন শুধু ময়লা ফেলা হয়। বর্জ্যের পানি আমার পুকুরে গিয়ে পড়ছে, মাছ চাষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাগুরা পৌরসভার সাবেক এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বাস্তবসম্মত ছিল না প্রকল্পটি। মূলত কাগজে-কলমে ছিল বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদনের বিষয়টি। বাস্তবে সেই সক্ষমতা বা প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি কখনো। ফলে এখন শুধু ময়লা ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে প্রকল্পটি। মাঝখান থেকে খরচ দেখানো হয়েছে কোটি কোটি টাকা।’
এ বিষয়ে মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বারী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বর্তমানে প্রকল্পটিতে শুধু ময়লা ফেলা হচ্ছে। শুরু থেকেই এখানে বায়োগ্যাস বা জৈব সার উৎপাদনের কার্যক্রম চালু হয়নি। নানা কারণে তা আর সম্ভবও নয়। এটি এখন শহরের বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।’
সম্প্রতি মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার বিষয়ে পৌরসভার গঠিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা তাপস ব্যানার্জি বলেছেন, ‘ময়লা ফেলার স্থানটি ভরাট হয়ে গেছে। পৌরসভার স্কেভেটর যন্ত্র নষ্ট থাকায় দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করা যাচ্ছে না। কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে শুরু থেকেই কোনো রিসাইক্লিং কার্যক্রম ছিল না এখানে।’ ‘প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন এখন আর বাস্তবসম্মত নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।






