রাজশাহীতে বিষাদের সুরে দেবী দুর্গাকে পদ্মায় বিসর্জন

ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহীতে ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খধ্বনির মধ্যে পদ্মার জলে বিসর্জন দেয়া হলো দেবী দুর্গার প্রতিমা। সিঁদুরে রাঙা মুখে উৎসবের আনন্দ, চোখে বিদায়ের অশ্রু। কয়েক দিনের পূজা-অর্চনা, বরণ আর সিঁদুর খেলার পর প্রিয় দেবীকে বিদায় জানালেন ভক্তরা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে রাজশাহীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার শেষে নগরীর ফুতকিপাড়া পদ্মার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। বিদায়বেলায় ভক্তদের প্রার্থনা- অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও কল্যাণ।
সকালে নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ঘণ্টাধ্বনি, শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো। দেবীর চরণে শেষবারের মতো অর্ঘ্য নিবেদন করেন ভক্তরা। ধূপ, ফুল ও বেলপাতায় চলে পূজা-অর্চনা। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সবার সুস্থতা এবং দেশ ও মানুষের শান্তি-সমৃদ্ধির প্রত্যাশা।
পূজা শেষে শুরু হয় দেবীকে বরণ ও সিঁদুর খেলা। লাল শাড়িতে সজ্জিত নারীরা দেবীর কপাল ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। এরপর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে মেতে ওঠেন উৎসবে। উলুধ্বনি আর ঢাকের তালে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। তবে আনন্দের আড়ালেও ছিল বিদায়ের বিষাদ। কয়েক দিন ধরে যে দেবীকে ঘিরে উৎসব, তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক ভক্ত।
নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দিনভর ছিল ভক্তদের ভিড়। দেবীর কাছে তাদের প্রার্থনা, অশুভ শক্তির বিনাশ হোক। শুভ শক্তির জয় হোক। পৃথিবীতে ফিরে আসুক শান্তি ও কল্যাণ।
সনাতন ধর্মাবলম্বী পল্লব কুমার শাহ বললেন, ‘এক বছর পর মা আমাদের মাঝে এসেছেন। আজ আবার তিনি চলে যাচ্ছেন। আমাদের চাওয়া, পৃথিবীর সব অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভ শক্তির উদয় হোক। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসুক।’
দুপুরে নগরীর ফুতকিপাড়া পদ্মার ঘাটে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। ভক্তরা দেবীকে সাত পাকে ঘুরিয়ে নৌকায় তোলেন। এরপর নৌকায় পদ্মার বুকে ঘুরিয়ে অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জন দেন তাঁরা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে ঘাট এলাকা। পদ্মার জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তদের মনে তখন আবারও মাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।
দুর্গোৎসবের বিদায়বেলায় রাজশাহীতে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথাও তুলে ধরেন আয়োজকেরা। নগরীর টাইগার সংঘ পূজামণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক পার্থ পাল চৌধুরী বললেন, ‘আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অনেক খুশি। প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীতে এসে আমাদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। রাজশাহীর মানুষ সবাই মিলেমিশে থাকেন। এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারছেন।’
রাজশাহীর সম্প্রীতির পরিবেশের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ নগরীতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।
দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান বলেছেন, পূজামণ্ডপগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
দেবী দুর্গার বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের শারদীয় উৎসব। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এক বছর পর নতুন শরতে আবারও মর্ত্যে ফিরবেন মা দুর্গা। সেই প্রত্যাশা নিয়েই বিদায়বেলায় তাঁকে প্রণাম জানিয়ে ঘরে ফিরেছেন ভক্তরা। পদ্মার জলে প্রতিমা বিলীন হলেও তাঁদের মনে রয়ে গেছে উৎসবের স্মৃতি আর আগামী শরতে দেবীর আগমনের প্রতীক্ষা।





