রোগীর ভিড় স্বাস্থ্যসেবায় টান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তি যেন দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিন ৬০০-৭০০ রোগী আসেন বহির্বিভাগে। জরুরি বিভাগেও সেবা নিতে আসেন শতাধিক মানুষ। অথচ ৫০ শয্যার হাসপাতালে ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ১৫৩ জন। চিকিৎসক ও কারিগরি জনবলের অভাবে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আর কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১২ সালে ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই হাসপাতালটির ৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ৫০ শয্যার উপযোগী নতুন জনবল কাঠামো হয়নি। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে রোগী আসেন ১২০-১৪০ জন। গড়ে ৫৫-৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে সীমিত জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
টেকনিশিয়ান না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে মেশিনটিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সনোলজিস্ট না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল না থাকায় ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে এসব পরীক্ষা করাতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে যেতে হয়।
হাসপাতালের সেবা নিতে আসা রোগীদের কাছে বিষয়টি শুধু বাড়তি ঝামেলা নয়, বাড়তি খরচেরও কারণ। শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা জসিম মিয়ার ভাষায়, কয়েক দিন আগে চিকিৎসক তাকে এক্স-রে করতে দেন। হাসপাতালে সেই পরীক্ষা করতে না পেরে শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে করাতে হয়েছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসায়ও ঘাটতি রয়েছে। ১২টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র চারজন। ২৯টি মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জনের পদের বিপরীতে আছেন ১২ জন। বিশেষ করে গাইনি ও অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় প্রসূতিদের চিকিৎসায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের ইনচার্জ হাসিনা আক্তারের ভাষ্য, প্রতিদিনই অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এখানে আসেন। স্বাভাবিক প্রসবের সেবা দেওয়া হলেও যেসব রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, তাদের অন্যত্র পাঠাতে হয়। চলতি মাসে প্রায় ১৫০টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। চা বাগান এলাকার অনেক দরিদ্র রোগী এই হাসপাতালে আসেন।
এই বাস্তবতা রোগীর স্বজনদের দুশ্চিন্তাও বাড়াচ্ছে। পরেশ কাহার তার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন গাইনি চিকিৎসক দেখাতে। তিনি জানালেন, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় এখন তাকে শহরের বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য কম হওয়ায় বেসরকারি চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন।
শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নয়, সাধারণ চিকিৎসাসেবায়ও রোগীর চাপের তুলনায় জনবল কম। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩টি নার্সের পদ পূর্ণ থাকলেও ১২টি স্যাকমো পদের বিপরীতে কর্মরত সাতজন। ফলে যেসব বিভাগে জনবল ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কর্মরতদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অভিজিৎ বণিকের দাবি, প্রতিদিন প্রচুর পরীক্ষা করতে হয়। জনবল না থাকায় তাকে একাই রক্ত সংগ্রহ, নমুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষা ও রিপোর্ট দেওয়ার কাজ করতে হয়।
জনবল সংকটের প্রভাব হাসপাতালের অন্যান্য সেবাতেও পড়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। মুমূর্ষু রোগীদের ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলিও নেই। ব্লাড ব্যাংক না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বাইরে থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধও অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অস্ত্রোপচার কার্যক্রমেও রয়েছে বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকি। বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএসের ব্যাটারি ও জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা গাইনি ও অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসক না থাকা। এ কারণে প্রসূতি মায়েদের সেবা দিতে বেশি সমস্যা হচ্ছে।’
‘হাসপাতালে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির যন্ত্র থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোক নেই। প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এত বড় হাসপাতালে মাত্র দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে কাজ চালানোও কঠিন’— যোগ করেন তিনি।
তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেবা চালিয়ে যাচ্ছে— জানিয়েছেন ডা. সিনথিয়া তাসমিন। তার ভাষ্য, পর্যাপ্ত জনবল পেলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল পাওয়া যায়নি।



