হবিগঞ্জে গ্যাসের খোঁজে
কিছু মিলবে নাকি শুধু ব্যয়
- ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে থ্রি-ডি সিসমিক সমীক্ষা
- ২০১০-এ বানিয়াচংয়ে খনন করে কিছু মেলেনি, সেখানে আবারও অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের খোয়াই ও সুটকী নদীর পাড়ে একসময় রাতভর চলত ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ। বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন সেখানে গ্যাসের সন্ধানে কূপ খনন করেছিল। কয়েক বছর অনুসন্ধানের পর গুটিয়ে নেয় সেই কার্যক্রম। স্থানীয়দের কাছে সেই অধ্যায়ের শেষটা ছিল রহস্যময়। প্রায় ১৬ বছর পর একই এলাকায় আবারও শুরু হয়েছে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান। তাই প্রশ্ন উঠেছে— যেখানে একবার আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি, সেখানে আবারও প্রায় কয়েকশ কোটি টাকার প্রকল্প কতটা যৌক্তিক?
দুটি সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধানে হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও চুনারুঘাট উপজেলায় ত্রিমাত্রিক ভূকম্পীয় সমীক্ষা (থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ) চালাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। ৮৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত এ কার্যক্রম ‘হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা ফিল্ডে থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ’ প্রকল্পের অংশ। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
বানিয়াচং উপজেলার সুটকী নদীর উত্তর-পশ্চিম তীরবর্তী এলাকায় ২০১০ সালে গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খনন করেছিল মার্কিন কোম্পানি শেভরন। কিন্তু প্রত্যাশিত গ্যাস মজুদ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ১৬ বছর পর একই এলাকায় আবারও নতুন করে গ্যাসের সম্ভাবনা খুঁজছে বাপেক্স। অন্যদিকে চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি ইউনিয়নের বড়আব্দা এলাকায়ও চলছে একই ধরনের সমীক্ষা। সম্প্রতি মাটির নিচ থেকে গ্যাস নির্গমনের খবর পাওয়ার পর সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
বাপেক্সের ভূ-ভৌত বিভাগের থ্রি-ডি ইন্টারপ্রেটেশন শাখার ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল মতিন মণ্ডল জানিয়েছেন, প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ড থেকে শুরু করে বানিয়াচং ও চুনারুঘাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় সমীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের পুরনো কূপগুলোয়ও নতুন করে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে।
তার ভাষ্য, আগামী তিন মাসের মধ্যে সমীক্ষা শেষ করে প্রতিবেদন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের কাছে জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে গ্যাসের মজুদের সম্ভাবনা পাওয়া গেলে পরবর্তী চার মাসের মধ্যে কূপ খননের কাজ শুরু হতে পারে। একটি কূপ খননে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
তবে এই প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা ও আইনজীবী দিদারুল আলম সৌরভ বলেছেন, ‘শেভরন যখন এখানে কাজ করেছিল, তখন বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। কয়েক বছর পর তারা হঠাৎ করেই চলে যায়। কী পাওয়া গিয়েছিল বা কেন কাজ বন্ধ হলো, সে বিষয়ে এলাকাবাসী কিছুই জানেন না। এখন একই এলাকায় আবারও সরকারি অর্থে বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আরও খোলাসা করা দরকার।’
একই প্রশ্ন তুলেছেন চুনারুঘাট উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল জাহির মিয়া। তিনি বলেছেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে এ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাই নতুন করে একই ধরনের কার্যক্রমের যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
শুধু স্থানীয়দের নয়, জ্বালানি খাতের ভেতর থেকেও উঠছে সংশয়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেছেন, বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের বেলায়ও অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যে পরিমাণ মজুদের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে উৎপাদন তার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। তার মতে, যে এলাকায় আগে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া যায়নি, সেখানে আবারও বিপুল ব্যয়ে অনুসন্ধান চালানোর যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
অবশ্য বাপেক্স ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশাবাদী অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ সম্প্রতি সমীক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শন করে বলেছেন, হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চল ও চা-বাগানঘেরা হবিগঞ্জ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে নতুন উৎসের সন্ধান নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। তবে প্রশ্ন হলো— আগে যেখানে অনুসন্ধান ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে আবারও শত কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন উদ্যোগ কি বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে, নাকি শুধু আরেকটি ব্যয়বহুল পরীক্ষা?




