নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে ভেজাল প্রসাধনী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আশপাশের এলাকাগুলো এখন নকল ও ভেজাল প্রসাধনীতে সয়লাব। অনলাইন পেজ থেকে শুরু করে এখানকার বহুতল মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলোয় দেশি-বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে এসব ক্ষতিকর পণ্য বিক্রি হচ্ছে অবাধে। ক্রেতারা না বুঝেই ত্বক ও রূপচর্চার জন্য এসব কসমেটিকস পণ্য কিনে পড়ছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
বিশেষ করে বাজারে এখন রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ও ফেসওয়াশের ব্যাপক চাহিদা দেখা যাচ্ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে রঙ ফর্সাকারী কোনো ক্রিম বা প্রসাধনী আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। মানুষের গায়ের রঙ মূলত প্রাকৃতিক উপাদান মেলানিনের ওপর নির্ভর করে, যা কোনো প্রসাধনী দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও ক্রেতারা এসব পণ্য কিনছেন প্রতারিত হয়ে।
বর্তমানে দেশের বাজারের প্রায় ৭০-৭২ শতাংশ প্রসাধনীই নকল ও ভেজাল উপাদান দিয়ে তৈরি। সরেজমিনে রূপগঞ্জের ভুলতা, গাউছিয়া, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, রূপসীসহ বিভিন্ন বড় মার্কেট ঘুরে দেখা যায় গার্নিয়ার, লরিয়েল, রেভলন, ডাভ, প্যানটিনের মতো নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল পণ্য এবং পাকিস্তানি চাঁদনী, নূর, ডিউ, গৌরীর মতো ক্ষতিকর রঙ ফর্সাকারী ক্রিম বিক্রি হচ্ছে।
অসাধু ব্যবসায়ীরা লেজার প্রিন্টের মাধ্যমে হুবহু আসল পণ্যের মতো মোড়ক তৈরি করে এ প্রতারণা চালাচ্ছেন। ভুলতা মার্কেটের এক বিক্রয়কর্মী জানালেন, ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চান বলেই তারা দোকানে এসব নকল কসমেটিকস রাখেন।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জের আল-রাফি হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম ফেরদৌস আগামীর সময়কে বললেন, ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি এসব প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বক পুড়ে যায়, চামড়া নষ্ট হয় এবং চেহারার বিকৃতি ঘটতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ক্যানসার, মাইগ্রেন, হাঁপানি ও স্নায়বিক দুর্বলতাও দেখা দেয়।
ভেজাল প্রসাধনীর ক্ষতিকর দিক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের এক গবেষণায় ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এসব নকল প্রসাধনীতে প্যারাবেন, ডাই ইথানল এমিন, বিএইচএ, পিইজি ও সোডিয়াম লিউরেল সালফেটের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি শিশুদের ব্যবহার্য পণ্যেও পাওয়া গেছে এসব বিষাক্ত উপাদানের অস্তিত্ব।
রোমানা আমিন নামের এক ভুক্তভোগী ক্রেতা বললেন, আমি গত বছর পাকিস্তানি নাইট ক্রিম ব্যবহার করেছি। এরপর থেকে আমার অ্যালার্জির সমস্যা শুরু হয়েছে। এখন মুখে মেছতা পড়েছে। মেছতা দূর করার জন্য আবার মেছতা গার্ড ক্রিম ব্যবহার করছি। অথচ ক্ষতি ছাড়া লাভ পাইনি। সর্বশেষ ডাক্তার দেখিয়েছি। তিনি বলেছেন, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে। এখন ভালো প্রসাধনী কোথায় পাব?
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে মানুষ আরও বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. মো. গোলাম মোর্তুজাও এসব নকল প্রসাধনীর ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নারায়ণগঞ্জের কর্মকর্তা হৃদয় রঞ্জন বণিক জানিয়েছেন, বাজারে নকল প্রসাধনীর বিরুদ্ধে বিএসটিআইয়ের সঙ্গে তাদের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খোলাবাজারের পাশাপাশি ভুয়া অনলাইন বিক্রেতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক অভিযানের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।




