কয়রা
ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জনবল নিয়োগে অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা, প্রশ্ন সনদ নিয়েও

ছবি: আগামীর সময়
খুলনার কয়রা উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদন করেন মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শাহনাজ নামে এক নারী। যাচাই-বাছাইয়ের পর বয়স বেশিজনিত কারণ দেখিয়ে আবেদনটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত ফলাফলে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে তাকে নির্বাচিত করা হয়। একই কারণ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয় মহারাজপুর ইউনিয়নের নিগার সুলতানা নামের এক নারীর। তাকেও পরবর্তীতে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া আবেদনের সময়সীমায় কৃত্রিম সংকট তৈরি, প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তুচ্ছ কারণে বাদ দেওয়া, রাত তিনটা পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ, ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণ না করে মূল্যায়ন, দেড় মাস পর ফলাফল প্রকাশসহ পুরো প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ফলাফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীরা এসব অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করেন। প্রশাসনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ব্যক্তিস্বার্থে ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার লক্ষে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে নিজেদের অনুসারীদের নির্বাচিত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিজ্ঞ প্রার্থী থাকার পরও কয়েকটি ওয়ার্ড থেকে কাউকে নির্বাচিত করা হয়নি। অথচ সেসব নেতাদের কথায় কোনও কোনও ওয়ার্ড থেকে তিনজন পর্যন্ত নির্বাচিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মহারাজপুর ইউনিয়নে তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত নিগার সুলতানার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন বয়স ৪০ বছর ২ মাস ১৮ দিন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়স ৪০ নির্ধারণ করা হলেও তাকে নির্বাচিত করা হয়।
এ ছাড়া মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শাহনাজ নামে নির্বাচিত নারী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। পরে ইউনিয়নের এক বিএনপি নেতা যিনি চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা করছেন তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। বয়স বেশি দেখিয়ে বাতিল করা শাহনাজের আবেদনে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে এইচএসসি পাশের সনদের সত্যায়িত কপি যুক্ত করা হয় এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ড থেকে ২০০২ সালে দাখিল পাশের কপি সংযুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে জিপিএ পদ্ধতিতে ফলাফল প্রকাশ করা হলেও তার সাময়িক সনদে ২য় বিভাগে পাশের কথা উল্লেখ রয়েছে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তার রোল নম্বর ওয়েবসাইটে সার্চ করে পাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া দাখিল ও এইচএসসির সনদে পিতার নাম কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আগে তিনি কখনো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শুমারির কাজ করেননি।
এদিকে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কপিতে ২১ জুলাই লেখা থাকলেও প্রকাশ করা হয় ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বিকালে। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২৫ জুলাই। ২৪ ও ২৫ জুলাই সরকারি ছুটি থাকায় প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়নে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পরবর্তীতে দু'দিন আবেদনের সময় বাড়ানো হয়। স্নাতক পাশ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের শুমারিতে কাজের অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও সেটা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচিত হতে ব্যবহারিক পরীক্ষায় সর্বনিম্ন ৭০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার বাধ্যবাধকতা উল্লেখ থাকলেও নেওয়া হয়নি কোনও ব্যবহারিক পরীক্ষা। মৌখিক পরীক্ষার সময় উপজেলা আইসিটি দপ্তরের সহকারী প্রোগ্রামার জয়ন্ত কুমার মন্ডল দু-একটি প্রশ্ন করলেও মার্কিং করেননি বলে জানা যায়।
জানা যায়, সাত ইউনিয়নে ৮১ জন তথ্যসংগ্রহকারী ও ৮ জন সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়। এর বিপরীতে ৯৪৯ জনের আবেদন জমা পড়ে। ডকুমেন্ট সত্যায়িত না থাকা, বয়স বেশি, আবেদনে স্বাক্ষর না থাকা, এলাকার নাম না থাকাসহ বেশ কিছু কারণ দেখিয়ে ৩০ জুলাই ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে ৩৫৬ জনের আবেদন বাতিল করা হয় এবং পরের দিন শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়।
ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার সময় তিনবার পরিবর্তন করা হয়। ২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও দুপুর থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী দুই দিনও দেরিতে শুরু করে রাত দুইটা পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। চরম ভোগান্তির পরেও ফলাফল প্রকাশ করতে দেড় মাস সময় নেওয়া হয়। এ ছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর করা ফলাফল ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রকাশ করা হয়।
এদিকে, বিবিএসের শুমারির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই আমাদী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফুল সানা, কয়রা সদর ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা মেহেদী হাসান সবুজ এবং উপজেলা সাইবার দলের সেক্রেটারি হারুন অর রশীদ সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত হয়েছেন। মোট নির্বাচিত আট জন সুপারভাইজারের মধ্যে ৭ জনসহ অধিকাংশ তথ্য সংগ্রহকারীদের বিএনপির অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কিংবা কতিপয় নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সুবিধার জন্য সুপারিশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে।
এ ছাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদের বোনজামাই আব্দুর রহিমকে তথ্য সংগ্রহকারী পদে নির্বাচিত করার বিষয়েও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা।
তানিয়া নামে মহারাজপুর ইউনিয়নের এক পরীক্ষার্থী বলেন, আমি এর আগে তিনবার বিবিএসের আওতায় তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে কাজ করেছি। সারাদিন অপেক্ষা করে রাত ১২টার দিকে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছি। কোনও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। কিন্তু ফলাফলে আমাদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের আবেদনকারী হায়দার আলী বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সত্যায়িত করার কথা বলা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সত্যায়িত না থাকার অজুহাতে আমার আবেদন বাতিল করা হয়। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনার পরিচয় মিলেছে।
তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনকারী শারমিন আক্তার বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। এ ছাড়া স্বামীর সূত্রে আমি মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এর আগেও বিবিএসের দুটি শুমারিতে কাজ করি এবং এমএ পাশ। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও এবার প্রথমে আমার আবেদন বাতিল করা হয়।
জিয়াউল হক নামে আরেক আবেদনকারী জানান, বিবিএস এর আওতায় চারবার শুমারির কাজ করেছি। এবারও ভালো পরীক্ষা দিয়েছি। অথচ আমাদের ওয়ার্ড থেকে কাউকেই নেওয়া হয়নি।
কয়রা উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মাহমুদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজনের ছবি প্রকাশ করে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেছেন।
সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, যুবদলের একজন প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কয়েকজনের নাম ফলাফলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে দলের মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
কয়রা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইউনুস আলীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ফেসবুকে লেখেন, রাত তিনটা পর্যন্ত ভাইভা নিয়ে নাটক করার দরকার কি ছিল? সরাসরি নেতার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতেন।
অভিযোগের বিষয়ে কয়রা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদের ভাষ্য, বয়স বেশির কারণে বাদ পড়া প্রার্থী আপিল করেন এবং ভাইভা বোর্ডে তার মূলকাগজপত্র দেখে সঠিক মনে হওয়ায় আবেদন গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া আব্দুর রহিম আমার আপন ভগ্নিপতি হলেও তিনি মেধার ভিত্তিতেই নির্বাচিত হয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন ইউএনও স্যার নিজেই করেছেন। আর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছে। স্যার ভালো বলতে পারবেন।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেছেন, দলীয় কিংবা স্বজনপ্রীতি নয় বরং যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। কোন ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





