নদী নেই খাল নেই, তবুও ১২ কোটি টাকায় হচ্ছে সেতু!

ছবি: আগামীর সময়
চারপাশে সারি সারি ঘরবাড়ি আর ফসলি জমি। নেই কোনো নদী, নেই কোনো খাল-বিল কিংবা ন্যূনতম পানির প্রবাহ। এক পাশে ছোট্ট একটি ডোবা থাকলেও তার ওপর মস্ত বড় এক সেতু নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে দিনরাত। কোনো জলাশয় ছাড়া শুধু ডাঙার ওপর এমন বিশাল সেতু তৈরির দৃশ্য দেখে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অবাস্তব ও আজব মনে হলেও, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় ঠিকাদারদের হাত ধরে এমনই এক 'ডাঙার সেতু'র বাস্তবায়ন করছে ফরিদপুর সড়ক বিভাগ।
সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ-তাড়াইল আঞ্চলিক সড়কের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কালিখোলা নামক স্থানে। জানা গেছে, ৪৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার চওড়া এই সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে সড়ক বিভাগ। ইতিমধ্যে সেতুর পাইলিংয়ের কাজও শুরু হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজটি করছে অবরন ট্রেডার্স লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যার স্বত্বাধিকারী মো. মাজেদ শেখ।
একসময় এই স্থানে ভুবনেশ্বর নদী থেকে বের হয়ে আসা ‘গোপালপুর শাখা খাল’ নামে একটি বহমান খাল ছিল। সেই সময় খালের ওপর পারাপারের জন্য এলজিইডি থেকে ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের একটি ছোট ব্রিজ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে খালের দুই পাশেই গড়ে উঠেছে একের পর এক বাড়িঘর। বর্তমানে সেই খালের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই, তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।
আঞ্চলিক সড়কটির বিভিন্ন স্থানে থাকা আগের ছোট-বড় সেতুগুলোর বেশিরভাগই এখন আর নেই। অপ্রয়োজনীয় মনে করে সেগুলোর জায়গায় রাস্তা সমান করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কালিখোলার এই স্থানে খাল না থাকা সত্ত্বেও কেন ১২ কোটি টাকা খরচ করে নতুন করে মস্ত বড় ব্রিজ তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় গ্রামবাসী ফজলুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, 'আমরা জানি ব্রিজ মানে হচ্ছে জলাশয়ের ওপর দুটি পাড়ের সেতুবন্ধন। কিন্তু এখানে সেতুবন্ধন তো দূরের কথা, চারপাশে ঘরবাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। দুই পাশেই মানুষ বসতি গড়ে তুলেছে, এখানে ব্রিজের কোনো দরকারই ছিল না। এতে সরকারের বড় অঙ্কের টাকা নষ্ট হচ্ছে।'
আরেক গ্রামবাসী মো. তারা প্রামাণিক জানালেন, 'একটা সময় এখানে ব্রিজের খুব দরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন আর এর কোনো প্রয়োজন নেই। এ যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার অবস্থা।'
স্থানীয়দের মতে, এই ব্রিজটিও ভেঙে অন্যগুলোর মতো রাস্তা সমান করে দিলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপ হতো না।
রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কাইমুদ্দিন মন্ডলের ভাষ্য, 'যখন খাল ছিল তখন ওখানে ব্রিজ প্রয়োজন ছিল। কালের বিবর্তনে ওই স্থানে এখন কোনো খাল নেই। কিন্তু সরকার কেন যে এখানে আবার নতুন করে ব্রিজ নির্মাণ করছে, ব্যাপারটি আমার বোধগম্য নয়। এসব প্রকল্প নেওয়ার আগে আরও বেশি জরিপ করা উচিত ছিল। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না।'
সেতুর নির্মাণাধীন এলাকায় দায়িত্ব থাকা সাইট ইঞ্জিনিয়ার বাবু হোসেন ৪৪ মিটারের সেতুটি নির্মাণের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, কেন এখানে অপ্রয়োজনীয় এই সেতু করা হচ্ছে তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নদী-নালা কিংবা খাল না থাকা সত্ত্বেও কেন এই সেতু তৈরি হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন ওই অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) মো. জাহাঙ্গীর। অদ্ভুত এক সরকারি নিয়মের দোহাই দিয়ে তিনি বলেছেন, 'পূর্বের সময় থেকেই এই স্থানে একটি ব্রিজ ছিল। এ কারণে আমরা সেই অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকায় পাঠানোর পর প্রকল্প পাস হয়ে আসে। যেহেতু নথিপত্রে আগে এখানে ব্রিজ ছিল, তাই আমাদের নতুন প্রতিবেদনেও ব্রিজ তুলে ধরেই পাঠাতে হবে। ওই স্থানে এখন ব্রিজের কোনো প্রয়োজন নাই—এটা আমরা ফাইলে লিখতে পারি না।'
সরকারি ফাইলের এই অদ্ভুত মারপ্যাঁচ আর আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে পড়ে খালের অনুপস্থিতিতেও ডাঙার ওপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ১২ কোটি টাকার এক বিশাল সেতু, যা দেখে কেবলই মাথা চুলকাচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।




