অসুস্থতার ভারে থমকে গেছে দোলনা কারিগর নগেনের জীবন

বাড়ির উঠানে দোলনা তৈরির কারিগর নগেন চন্দ্র মোহন্ত, ছবি : আগামীর সময়
শিশুদের ঘুম পাড়াতে দোলনা তৈরির কারিগর নগেন চন্দ্র মোহন্তের নিজের জীবনেই শান্তি নেই। দীর্ঘদিনের জটিল অসুস্থতা ও চরম আর্থিক সংকটে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না ৫৬ বছর বয়সী এই কারিগর। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলেও এতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হবে। সেই অর্থ জোগাড় করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
দিনাজপুরের বিরামপুর পৌর শহরের রেলস্টেশন এলাকায় স্ত্রী দ্রৌপদী রানীকে নিয়ে বসবাস করেন নগেন চন্দ্র। চার বছরের বেশি সময় ধরে শুক্রাশয়ের সংক্রমণ, গোদরোগ, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি। আক্রান্ত স্থান ফুলে গিয়ে মাঝেমধ্যে তীব্র ব্যথা হয়। তখন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। গ্রাম্য চিকিৎসকসহ বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিলেও অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেননি। এতে সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়েছে।
শুক্রবার নগেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আঙিনায় বসে দোলনার কাঠিতে নীল রং করছেন তার স্ত্রী দ্রৌপদী রানী। পাশে অসুস্থ শরীর নিয়ে দোলনার গোলাকার ফ্রেমের ভেতরে বসে মোটা সুতা দিয়ে কাঠিগুলো জোড়া লাগাচ্ছেন নগেন। অসুস্থতার আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি দোলনা তৈরি করলেও এখন সর্বোচ্চ দুটি তৈরি করতে পারেন তারা।
বাঁশের চিকন কাঠি দিয়ে তৈরি গোলাকার ফ্রেমে লাল, সবুজসহ বিভিন্ন রঙের কাঠি আড়াআড়িভাবে সাজিয়ে মোটা সুতা দিয়ে জুড়ে দেন নগেন। পরে ফ্রেমে লাগানো হয় রঙিন দড়ি। এভাবেই তৈরি হয় শিশুদের দোলনা। বাজার থেকে বাঁশ, প্লাস্টিকের ফিতা ও রং কিনে বাড়িতে এনে দোলনা তৈরি করে স্থানীয় দোকানে সরবরাহ করেন তিনি।
নগেন ও তার স্ত্রী জানান, বর্তমানে দিনে সর্বোচ্চ দুটি দোলনা তৈরি করতে পারেন তারা। এতে আয় হয় মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অথচ নগেনের প্রতিদিনের ওষুধেই খরচ হয় প্রায় ১৯৪ টাকা। এর বাইরে ছেলের পড়াশোনা, খাবার ও সংসারের অন্যান্য খরচ রয়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই সংকটে পড়তে হচ্ছে তাদের।
দ্রৌপদী রানী জানান, তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন বছর আগে। ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে মাসখানেক আগে। ছেলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। মেয়েরা সংসারে না থাকায় এখন স্বামীর দোলনা তৈরির কাজে তিনিই একমাত্র সহযোগী।
নিজের অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের কথা বলতে গিয়ে নগেন চন্দ্র বলেন, ‘শরীরের অসুখ নিয়ে খুব কষ্টোত আছো। এই শরীর নিয়ে আগের মতো আর দোলনা বানবার পারো না। আয়-রোজগারও আগের মতো হয় না। তার ওপোরোত আবার ডেইলি ১৯৪ টাকার ঔষধ কিনবার নাগে। অ্যালা চিন্তা করলে তো দুচোখোত আন্দার দ্যাখো। ডাক্তার কইছে অপারেশন করবার নাগবে। এক লাখ টাকার মতো খরচ হইবে। এত টাকা মুই কোত্তে পাবু। কেউ যদি হেল্প করলো হয়, তাহলে তো অসুখ সারলো হয়।’
নগেন চন্দ্র জানান, তার পৈতৃক বাড়ি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্দিরা গ্রামে। সেখান থেকে কোনো জমি-সম্পদ পাননি তিনি। তার প্রয়াত বাবা নকুল চন্দ্র মোহন্তও দোলনা তৈরির কারিগর ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই এই কাজ শেখেন নগেন।
শুরুতে দোলনা তৈরি করে বগুড়ার সান্তাহার বাজারে বিক্রি করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে দোলনা নিয়ে বিরামপুর শহরেও আসতেন। সেখানে ভালো বিক্রি হওয়ায় প্রায় ২০ বছর আগে বিরামপুর পৌর শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে ঢাকা মোড়ে দোলনার দোকান দেন। পরে বিরামপুর রেলস্টেশন এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে ঘর তুলে বসতি গড়েন।
অসুস্থতার কারণে এখন আগের মতো কাজ করতে না পারায় তার আয়ও কমে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা তো দূরের কথা, সংসারের নিত্যদিনের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল জানিয়েছেন, নগেন চন্দ্র সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে চাইলে হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা চলাকালে ওষুধ কেনার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকেও আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।
নগেন চন্দ্রের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা কিংবা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা পেলে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারবেন। সুস্থ হয়ে আবারও নিজের হাতে দোলনা তৈরি করে সংসারের হাল ধরতে চান এই কারিগর।




