রাজশাহীতে সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ : পৃথক দুর্ঘটনায় ঝরল ৪ প্রাণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঝরছে প্রাণ। পরিবার হারাচ্ছে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। আবার কোনো পরিবার একসঙ্গে হারাচ্ছে দুই সন্তান। গতকাল শুক্রবারও ছিল তাই। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার মোহনপুর ও পুঠিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চারজন। আহত হন আরও একজন।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বালিবোঝাই ট্রাকের নিচে চলে যায়। মোটরসাইকেলে ছিলেন তিনজন। মুহূর্তেই সব শেষ। ঘটনাস্থলেই মারা যান কেশরহাট পৌর এলাকার সাকেয়া গ্রামের রফিজ উদ্দিনের ছেলে কাইযুম ইসলাম রাতুল (১৮) এবং সিংহমারা গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে লিমন (২২)। গুরুতর আহত হন রাতুলের বড় ভাই স্বাধীন (২২)। তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সবাই তখন একটাই আশা করছিলেন— স্বাধীন অন্তত ফিরে আসুক। কিন্তু সেই আশাও ভেঙে যায়।
আজ শনিবার সকালে হাসপাতাল থেকেই আসে আরও একটি মৃত্যুসংবাদ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্বাধীন। এক রাতেই দুই ছেলেকে হারায় রফিজ উদ্দিনের পরিবার। শুক্রবার রাতে ছোট ছেলে রাতুলের মৃত্যুর খবরে যখন বাড়িতে শুরু হয়েছিল স্বজনদের আহাজারি, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা হাসপাতালের করিডোরে স্বাধীনকে বাঁচানোর জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। তবে সকালের আলো আর নতুন কোনো আশা নিয়ে আসেনি।
দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাকেয়া গ্রামে নেমে আসে শোকের মাতম। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন— সবাই ছুটে আসেন শোকাহত পরিবারটির পাশে। পুরো গ্রাম যেন এক পরিবারের বেদনা নিজের করে নেয়।
মোহনপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানালেন, নিহত রাতুলের বাবা মামলা করেছেন। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। চালক পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এর মাত্র এক ঘণ্টা পর আরেকটি দুর্ঘটনার খবর আসে পুঠিয়া থেকে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে বানেশ্বর এলাকায় একটি ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান ভ্যানচালক মো. মানিক চাঁদ (৬০)।
স্থানীয়রা জানান, উল্টো দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে ভ্যানটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ছিটকে পড়ে আহত হন মানিক চাঁদ ও তার সহযোগী শিবলু হোসেন (৫০)। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মানিক চাঁদকে মৃত ঘোষণা করেন। শিবলু এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পুঠিয়া থানার ওসি মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনাই অপ্রত্যাশিত। আমরা দুর্ঘটনার কারণ খুঁজছি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, রাজশাহী অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই মিলছে প্রাণহানির খবর। বিশেষ করে মোটরসাইকেল এবং ভারী যানবাহনের সংঘর্ষে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, রাতের বেলায় ভারী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং দুর্বল তদারকিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে সারা দেশে ৬৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯ জন নিহত হয়েছে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক প্রাণহানি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে গত জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়েছে।







