নানা বিরোধে বন্ধ হলো বোয়ালমারীর ১২৫ বছরের নৌকাবাইচ

সংগৃহীত ছবি
নিরাপত্তা শঙ্কাসহ নানা বিরোধে ফরিদপুরের বোয়ালমারীর শেখর ইউনিয়নের তেলজুড়ী বাজারসংলগ্ন কুমার নদে এবার নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা হচ্ছে না। ১২৫ বছর ধরে চলে আসছে এই আয়োজন। নৌকাবাইচকে ঘিরে প্রতিবছর বসে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা। এটি স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও বিনোদনের অন্যতম বড় আয়োজন। এবার মেলা বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলজুড়ী বাজারসংলগ্ন কুমার নদে শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে বসা মেলাটি তেলজুড়ী নৌকাবাইচের মেলা নামে পরিচিত। তাদের কাছে এটি বিশ্বাস বা হাজামের মেলা নামেও পরিচিত।
স্থানীয় রীতি অনুযায়ী, প্রতিবছর বাজার বণিক সমিতি ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে মেলা পরিচালনার জন্য কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ কমিটির সভাপতি করা হয় বিএনপি নেতা শাকির আহমেদ শাকু ফকিরকে। সাধারণ সম্পাদক করা হয় সাবেক ইউপি সদস্য মো. রহমান মেম্বারকে।
সম্প্রতি মেলা আয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কমিটির বৈঠকে মতবিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে সভাপতি শাকির আহমেদ শাকু ফকির পদত্যাগ করেন। এতে কমিটিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। আর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মেলা বন্ধ রাখার।
কমিটির সাবেক সভাপতি শাকির আহমেদ শাকু ফকির জানান, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া মেলা আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। গত জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল বাশারের সমর্থক একটি পক্ষ মেলা আয়োজনে বাধা দিচ্ছিল। বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলেও জানান।
তিনি আরও জানালেন, তিনি অন্যদের দায়িত্ব নিয়ে মেলা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নিজেও সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, এ বছর মেলা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ নাকচ করেছেন মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রহমান মেম্বার। তিনি জানালেন, নিরাপত্তাজনিত কারণেই এবার মেলা বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বললেন, গত বছর মেলা-পরবর্তী সময়ে সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রামের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল। এবারও মেলার কয়েক দিন আগে ময়েনদিয়া, জয়পাশা, ধুলজোড়া ও পরমেশ্বরদীর লোকজনের সঙ্গে খারদিয়া গ্রামের লোকজনের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ৪০ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে মেলা হলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা ছিল।
রহমান মেম্বার আরও জানান, মেলা আয়োজনের জন্য অর্থেরও প্রয়োজন হয়। প্রতিবছর দুই গ্রামের শিল্পপতিদের মধ্য থেকে কাউকে প্রধান অতিথি করা হয় এবং তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেন। এবার কোনো স্পনসরও পাওয়া যায়নি। এসব কারণে মেলা বন্ধ রাখা হয়েছে।
মেলার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত মিষ্টির দোকানি আ. জব্বার মোল্যা বললেন, বংশপরম্পরায় তাদের পরিবার প্রায় ১০০ বছর ধরে এ মেলায় মিষ্টি বিক্রি করে আসছে। তার দাদা ও বাবা এবং পরে তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে আমিত্তি, গজা, দানাদার ও জিলাপি বিক্রি করছেন।
আ. জব্বার মোল্যা বললেন, এবার মেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ময়দা, চিনি ও বেসন কিনেছেন। ইতোমধ্যে কয়েক মণ মিষ্টিও তৈরি করা হয়েছে। মেলা বন্ধ হওয়ায় তার প্রায় দুই লাখ টাকা ক্ষতি হবে।
মেলা বন্ধের বিষয়ে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে জানিয়েছেন শেখর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, মেলা কমিটি সহযোগিতা চাইলে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগে মেলা কমিটির সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন কমিটি মেলা আয়োজনের কথা জানিয়েছিল। মেলা বন্ধের বিষয়ে তাকে কেউ কিছু জানায়নি। ঐতিহ্যবাহী এ মেলা যাতে অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন।
গত বছরও মেলাকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা ঘটে। পরে জয়পাশা গ্রামে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে খারদিয়ার লোকজন তেলজুড়ীতে হামলা চালায় বলে জানায় স্থানীয়রা। হামলাকারীরা ১৮টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে উভয়পক্ষের প্রায় ৩০ জন আহত হন।
ভোর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে তেলজুড়ী ব্রিজসংলগ্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।




