সুন্দরবন
মধুর বদলে নির্যাতন-মুক্তিপণ

সংগৃহীত ছবি
সুন্দরবনের দস্যুদের কবলে পড়ে মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন কয়রার ১৩ মৌয়াল। বনদস্যুরা তাদের নগদ টাকা, মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুট করার পাশাপাশি পরিবারের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। একই সঙ্গে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সঙ্গে দস্যুদের যোগসূত্র থাকার অভিযোগও তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
রবিবার (১০ মে) বিকালে কয়রা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মৌয়ালরা।
তাদের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবার সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে দুটি নৌকায় করে ১৩ জন মৌয়াল মধু সংগ্রহে যান। বিকাল ৫টার দিকে শিবসা নদীসংলগ্ন কুমড়াখালী খালে পৌঁছালে ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে পরিচিত বনদস্যুরা তাদের নৌকা ঘিরে ফেলে। পরে সুন্দরবনের গভীরে নিয়ে দুদিন আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
মৌয়ালদের দাবি, দস্যু দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ২৮ থেকে ৩০ জন। তাদের কাছে চারটি বন্দুক, দুটি পাইপগান, একটি রাইফেলসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল। দস্যুরা তাদের কাছে থাকা ৪২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং নষ্ট করে দেয় মধু সংগ্রহের সব সরঞ্জাম। পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দেনদরবারের একপর্যায়ে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা পাঠানোর পর শনিবার বিকালে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। পরে রাতে তারা বাড়ি ফেরেন।
মৌয়াল দলের সর্দার আব্দুল গফুর গাজী উল্লেখ করেন, ‘এক হাজার টাকায় দুইশ গ্রাম মধু দেওয়ার শর্তে ঋণ নিয়ে মধু কাটতে গিয়েছিলাম। ডাকাতরা সব কেড়ে নিয়েছে। এখন কী খাব আর পাওনাদারদের টাকা কীভাবে শোধ করব, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’
মৌয়াল হারুন গাজী দাবি করেন, জিম্মি অবস্থায় দস্যুরা তাদের বলেছে, ‘তোরা হাসান মেম্বারের কাছে টাকা না দিয়ে কেন বনে ঢুকছিস? তার কাছে জনপ্রতি চার হাজার টাকা দিলে তোদের আটকাতাম না।’
তার অভিযোগ, আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হাসান ওরফে হাসান মেম্বারের সঙ্গে বনদস্যুদের যোগাযোগ রয়েছে।
আরেক মৌয়াল খোকন মণ্ডল মন্তব্য করেন, আগে তারা হাসান মেম্বারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানতেন না। জিম্মি হওয়ার পর দস্যুদের মুখে শুনেছেন, অস্ত্র কেনার জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং বনে ঢুকতে হলে তার কাছ থেকে ‘টোকেন’ নিতে হয়।
প্রায় ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে যাওয়া পরিমল সরকার তুলে ধরেন, বন থেকে মাছ-কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহ ও গোলপাতা কেটে তাদের সংসার চলে। কিন্তু এবার ঋণ করে মধু সংগ্রহে গিয়ে সব হারিয়েছেন। এখন পরিবার চালানো ও ঋণ পরিশোধ নিয়েই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন।
মৌয়ালদের আরও অভিযোগ, বানিয়াখালী গ্রামের বিপুল মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি দস্যুদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তিনি দস্যুদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি লুট করা মধু সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন।
তারা জানান, দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউলের বাড়ি কয়রার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে। এ ছাড়া আল-আমিন বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীসহ আরও কয়েকটি দল সুন্দরবনে দস্যুতা করছে। এসব বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশই স্থানীয় হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সরকারের হস্তক্ষেপও দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য আবুল হাসান জানান, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হচ্ছে। তার ভাষ্য, এলাকার শাহাদাত কবিরাজের মেয়ের জামাই আফজাল বনদস্যু দলের সদস্য। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তার নাম ব্যবহার করে মৌয়ালদের মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, শনিবার রাতে দুটি নৌকায় করে ১৩ জন মৌয়াল সুন্দরবন থেকে ফিরে এসেছেন। তারা বনদস্যুদের কবলে পড়েছিলেন বলে শুনেছেন। তবে এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বনদস্যুতা নির্মূলে বন বিভাগ কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।




