ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
রেডিওথেরাপি বন্ধ ১১ বছর
- ২০১৫ সাল থেকে রেডিওথেরাপি মেশিন বিকল
- প্রতিদিন ৮-১০ রোগীকে রেফার করা হচ্ছে ঢাকায়
- টাকার অভাবে অনেকে ঢাকায় যেতে পারেন না

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিনটি ১১ বছর ধরে বিকল। ফলে ক্যানসার আক্রান্ত জটিল রোগীদের রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে রেডিওথেরাপির জন্য রোগীদের ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু টাকার অভাবে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে না পেরে অনেক রোগী ভুগছেন, কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন।
এদিকে ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক সুবিধা সংবলিত একটি ভবন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও নির্মাণকাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চররঘুরামপুর এলাকার গৃহকর্মী সুফিয়ার স্বামী সুরুজ আলী (৫০) দেড় বছর ধরে গলার ক্যানসারে আক্রান্ত। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় গিয়ে রেডিওথেরাপি নিতে বলেছেন ছয় মাস আগে। কিন্তু টাকার অভাবে সুফিয়া স্বামীকে আর ঢাকায় নিয়ে যেতে পারেননি। স্বামীর চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ধার করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এমন ঘটনা শুধু সুফিয়ার পরিবারের নয়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ক্যানসার আক্রান্ত বহু দরিদ্র মানুষের। যারা ঢাকায় যাচ্ছেন তারাও সরকারি হাসপাতালে সহজে এ সুবিধা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন। এতে বিপুল টাকা ব্যয় হচ্ছে তাদের।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখানে ক্যানসার রোগীদের কেমোথেরাপি দেওয়া হয়, ক্যানসার-সার্জারি হয়ে থাকে। কিন্তু জটিল রোগীদের ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম পদ্ধতি রেডিওথেরাপি এখানে দেওয়া হয় না ১১ বছর ধরে। কারণ ২০১৫ সাল থেকে রেডিওথেরাপি মেশিনটি নষ্ট।
এই হাসপাতালে ১৯৯৬ সালে প্রথম রেডিওথেরাপি মেশিন আসে। তখন নামমাত্র মূল্যে এখানে রেডিওথেরাপি নিতে পারতেন রোগীরা। মেশিনটি সচল থাকা পর্যন্ত প্রতিদিন ৩০-৩৫ রোগী রেডিওথেরাপি নিতে পারতেন। এখনো প্রতিদিন এ হাসপাতালে ৬০-৭০ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী আসেন। তাদের মধ্যে ৮-১০ জনকে রেডিওথেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এখানে রেডিওথেরাপির সুবিধা না থাকায় এসব রোগীকে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, ঢাকায় সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। এতে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে। তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নেন। এতে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ পড়ে।
সম্প্রতি হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগে গিয়ে কথা হয় ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার আবু রায়হানের সঙ্গে। আবু রায়হান জানালেন, তার বাবাকে ঢাকায় নিয়ে রেডিওথেরাপি দিতে হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে তাদের। চিকিৎসা করাতে গিয়ে এরই মধ্যে তাদের ছয়টি গরু বিক্রি করতে হয়েছে।
নেত্রকোনার সাবিনা নামে এক কলেজছাত্রী জানালেন, তার মাকে রেডিওথেরাপি দিতে হবে। তাদের মধ্যবিত্ত পরিবার। এখন দুশ্চিন্তায় আছেন ঢাকায় যাওয়া নিয়ে। কারণ ঢাকায় তাদের কোনো আত্মীয় নেই, যার বাড়িতে থেকে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারবেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. আহমেদ জাবির বললেন, ‘এখানে প্রায় ১১ বছর রেডিওথেরাপি দেওয়া বন্ধ। বাধ্য হয়ে আমরা রোগীদের ঢাকায় পাঠাই।’
এদিকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরেই ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা রেখে ১৭ তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৩ সালেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর ধাপে ধাপে সময় বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ভবনের ১৩ তলা পর্যন্ত নির্মাাণ সম্পন্ন হয়েছে। পুরো ভবন নির্মাণ শেষে শুরু হবে ভেতরের কাজ, বসবে যন্ত্রপাতি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বললেন, নতুন এ ভবনটির কাজ যত দ্রুত শেষ হবে তত আগে উন্নত সেবা পাবে ময়মনসিংহবাসী। তারা সবসময় সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন।
গণপূর্ত বিভাগ ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বললেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ শেষ না করার কারণে পুনঃদরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। দুই বছরের মধ্যে তারা পুরো নির্মাণকাজ শেষ করার আশা করছেন।




