ঝিনাইদহে সাড়ে তিন মাসে ১০ খুন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকি নতুন নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে মাদক ও চোরাচালানের প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই। পুলিশের তথ্য বলছে, গত সাড়ে তিন মাসে ছয় উপজেলায় অন্তত ৯৬টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১০ খুন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ৬৫ এবং চুরি-ডাকাতির ঘটনা রয়েছে ২১টি। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একের পর এক অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ছয় উপজেলার মধ্যে অপরাধের সংখ্যায় এগিয়ে সদর উপজেলা। পুলিশের হিসাবে, সাড়ে তিন মাসে এ উপজেলায় খুনের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। এ ছাড়া কালীগঞ্জ, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুরে একটি করে খুন হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, জমি ও সামাজিক বিরোধের মতো কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুনের পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৫টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২১, কালীগঞ্জে ১৭, মহেশপুরে ৯, হরিণাকুণ্ডুতে ৮ এবং শৈলকুপা ও কোটচাঁদপুরে ৪টি করে ঘটেছে।
পুলিশের ভাষ্য, জুলাই মাসে সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামে আট বছরের এক শিশুকে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। একই মাসে পোড়াহাটি গ্রামে ছয় বছরের এক শিশুকে পাটক্ষেতে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মুদিদোকানির বিরুদ্ধে মামলা হয়।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে এমন উদ্বেগের মধ্যেই সড়কগুলোয় ডাকাতির ঘটনাও ঘটেছে। কোটচাঁদপুর-সাবদারপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে গত ৩০ মে, ১০ ও ১৩ জুলাই ডাকাতির অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় গ্রামীণ ব্যাংকের দুই কর্মী ও আলমসাধুর যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। জহিরুল ইসলাম নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা ডাকাতদের হামলায় আহত হন।
শুধু মহাসড়ক বা নির্জন এলাকা নয়, জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় দিনের বেলায়ও ঘটছে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। পুলিশের হিসাবে, সাড়ে তিন মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ১৮টি এবং ডাকাতি হয়েছে ৩টি। এর মধ্যে ৩১ জুলাই শহরের আরাপপুর থেকে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মোটরসাইকেল চুরি হয়। এর এক সপ্তাহ পর ধোপাঘাটা নতুন সেতুর পাশে তিনটি দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। কালীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও ১০টি গরু চুরির তথ্য পাওয়া গেছে।
চুরির এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ ও মামলা করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে সিসিটিভির ফুটেজও দিয়েছেন। কিন্তু জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অগ্রগতি কম বলে অভিযোগ তাদের। ফলে মামলা করেও প্রতিকার না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। নিখোঁজের চার দিন পর গত রবিবার বিষয়খালী বেগবতি নদী থেকে রমজান আলী নামে এক পরিবহন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে অপরাধ বৃদ্ধির ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ৫ আগস্ট সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ মানববন্ধন করেন। তাদের অভিযোগ, মাদক, চুরি-ডাকাতি ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগী বেল্লাল হোসেন ও জহুরুল ইসলাম মনে করেন, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা না হলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়বে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে মাদকের বিস্তারের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আব্দুল আজিজের ভাষায়, ‘শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়ায় চুরি-ছিনতাই বাড়ছে।’ তার মতে, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবে প্রশাসনের মূল্যায়ন কিছুটা ভিন্ন। জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেছেন, ‘অপরাধ প্রবণতা আগের তুলনায় কিছুটা কমছে।’ মাদকের সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, মাদক নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অপরাধও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
অপরাধ দমনে জনবল ও যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে পুলিশ। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছানের দাবি, প্রায় ২০ লাখ মানুষের জেলায় ছয়টি থানা ও ক্যাম্পে পুলিশের জনবল প্রায় ১ হাজার ৬৫০ জন। রয়েছে যানবাহনের সমস্যাও। পুলিশ মাঠে কাজ করছে এবং চুরি-ডাকাতির ঘটনায় মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ২০ জনকে।





