হবিগঞ্জে এক বছরে পানিতে ডুবে মারা গেছে ২৫ শিশু

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ, চলছে কনে বিদায়ের প্রস্তুতি। চারদিকে তখন ব্যস্ততা। এমন সময় বাড়ির পুকুরে ভেসে ওঠে তিন শিশুর মরদেহ। পরে জানা যায়, খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনা গত বছরের ১৪ অক্টোবর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর এলাকায়।
এরপর জেলার লাখাই উপজেলায় ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। দুই সন্তানকে নিয়ে ইতালি থেকে দেশে ফিরেছিলেন এক প্রবাসী দম্পতি। গত ১০ জুলাই রাতে পরিবারের সদস্যরা আড্ডায় ব্যস্ত থাকাকালে বাড়ির সামনের পানিতে ডুবে মারা যায় তাদের এক সন্তান। শিশুটিকে দেশেই দাফন করে আবার ইতালিতে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।
শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, গত এক বছরে হবিগঞ্জ জেলায় সহোদরসহ অন্তত ২৫ শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে। প্রায় সব ঘটনাতেই দেখা গেছে, অভিভাবকদের অগোচরে খেলতে গিয়ে পুকুর, নদী বা অন্য জলাশয়ে ডুবে মৃত্যু হয়েছে শিশুদের।
সরকারিভাবে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত জেলায় অন্তত ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নবীগঞ্জ ও মাধবপুর উপজেলায় পাঁচজন করে, চুনারুঘাট ও লাখাইয়ে চকরজন করে, হবিগঞ্জ সদরে তিনজন এবং বাহুবল ও বানিয়াচংয়ে দুজন করে শিশু মারা গেছে।
বছরের পর বছর পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটছে। অধিকাংশ ঘটনায় অভিভাবকদেরও গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। অথচ হাওরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় এ বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেই
মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে নবীগঞ্জ উপজেলার তাকরিম আহমেদ (৫), তাহরিম চৌধুরী (৪), সাফওয়ান আহমেদ (২), রিহান আহমেদ (২) ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ (৮); বাহুবলের হাবিব উল্যা (৪) ও মোস্তাকিম বিল্লাহ (৬); বানিয়াচং উপজেলার দুই সহোদর সাদিয়া আক্তার (৭) ও জুবায়ের মিয়া (৫); লাখাই উপজেলার আব্দুল আজিজ (২) রুকন উদ্দিন (১৫), ইতালি থেকে আসা আরিশা আহমেদ (৮) ও আনাছ মিয়া (২); হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ইন্দ্রানী দাস (১০), জান্নাতুল ইসলাম শিমু (৬) ও রায়হান মিয়া (১২); চুনারুঘাট উপজেলার শামীমা আক্তার (১৩), সানিয়া আক্তার (৯), মুসকান আক্তার (১৩) ও সামিয়া আক্তার (৬); এবং মাধবপুর উপজেলার তামান্না আক্তার (৭), একরাম মিয়া (৭), ইয়ামিন মিয়া (৩), মোস্তাকিম মিয়া (১২) ও ইজাজুর চৌধুরী (১২)।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারের। পরিবারের বড়রা কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে শিশুরা খেলতে গিয়ে পানিতে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধে জেলার কোথাও উল্লেখযোগ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচির তথ্যও পাওয়া যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি বাহার উদ্দিন বলেন, “বছরের পর বছর পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটছে। অধিকাংশ ঘটনায় অভিভাবকদেরও গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। অথচ হাওরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় এ বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেই। গত ২৫ জুলাই ছিল ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’। এ দিনটি উপলক্ষে অন্তত সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রচারণা আয়োজন করা যেতে পারত।”






