ফারুক ওয়াসিফ
সাংবাদিকতার হারানো মর্যাদা ফিরে না পেলে দেশ বড় সংকটে পড়বে

রাজশাহীতে ‘এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ— সংগৃহীত
সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলেও বর্তমানে এটি সবচেয়ে দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেছেন, ‘সাংবাদিকতা যদি তার হারানো মর্যাদা, সততা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশ আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।’ একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার মোকাবিলায় ফ্যাক্ট চেকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
শুক্রবার বিকালে রাজশাহী জেলা সমবায় কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে রাজশাহী জেলার সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত ‘এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন তিনি। রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সবুর আলী।
ফারুক ওয়াসিফ বললেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে দেশের সাংবাদিকতা একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিগত সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করায় সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।’ এই প্রবণতাকে তিনি ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ (প্রিডেটরি জার্নালিসম) হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, এটি শুধু একটি বাস্তবতা নয়, বরং নতুন একটি তাত্ত্বিক ধারণা। সাংবাদিকতা শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও এটি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলছিলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমও নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে ভুল তথ্য প্রকাশ করছে। এর পেছনে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বড় ভূমিকা রাখছে। মানুষ যে তথ্য আগে থেকেই বিশ্বাস করতে চায়, সেটিই সহজে গ্রহণ ও ছড়িয়ে দেয়। ফলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে নারী নেত্রীরা, অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।
‘রাষ্ট্রের প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তাকাঠামো শক্তিশালী থাকলেও সাংবাদিকতা নামের চতুর্থ স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অথচ একজন সাংবাদিক শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেন না, তিনি সমাজ পর্যবেক্ষক, গবেষক ও লেখকও। আজকের সংবাদই একদিন ইতিহাসের দলিলে পরিণত হয়। তাই সাংবাদিকদের সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে’— যোগ করেন পিআইবির মহাপরিচালক।
তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা। এজন্য ফ্যাক্ট চেকিং দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগাতে হবে।’
পিআইবির চলমান কার্যক্রম তুলে ধরে ফারুক ওয়াসিফ মন্তব্য করেন, ‘প্রায় দুই দশক ধরে নতুন নিয়োগ না হলেও নিজস্ব জনবল দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে সাংবাদিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। গত ডিসেম্বরের আগেই প্রায় ৬০টি জেলা প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচনী সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের সময় রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে একযোগে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়েছে।’
রাজশাহীর প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘এটি বাংলাদেশের অন্যতম মার্জিত ও সভ্য শহর। এখানকার সাংবাদিকরা শুধু সংবাদকর্মী নন, সমাজের গভীর পর্যবেক্ষক এবং সাহিত্যচর্চার সঙ্গেও সম্পৃক্ত।’
তিনি জানান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী পিআইবিকে একটি একাডেমিক এক্সিলেন্স সেন্টারে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে মাস্টার্স, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানও পিআইবির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সাংবাদিকতার ভাষা ও উপস্থাপনা প্রসঙ্গে তার মত, সংবাদ শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়, এটি একটি চিন্তা ও ধারণার বহিঃপ্রকাশ। তাই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করতে হবে। ছোট, সহজ ও সরল বাংলায় লেখা সংবাদই পাঠকের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সংবাদকে গল্পের মতো আকর্ষণীয় করে তুলতে চরিত্র, উদ্ধৃতি ও বাস্তবতার সুষম ব্যবহার জরুরি।
কার্টুন বিতর্ক প্রসঙ্গে ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন, শৈল্পিক স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও থাকতে হবে। ক্ষমতা, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্টুন হওয়া উচিত। কিন্তু কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করা নৈতিক সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতীতে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরির প্রবণতা ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।





