বৈশাখী রং মেখে টিকে থাকার মলিন লড়াই

ছবিঃ আগামীর সময়
‘বৈশাখী আর গ্রামীণ মেলায়, শিশু-বুড়ি-নানিরা যায়, শখের মাটির হাঁড়ি ছাড়া, নানিদের হাত কি মানায়?’
রাজশাহীর গম্ভীরা গানের এই পঙক্তিতে গ্রামীণ মেলার সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বাস্তবে, সময়ের স্রোত ঠেলে নি:শব্দে লড়ছেন পালপাড়ার শিল্পীরা। প্রতি বৈশাখে নানা রঙে সেজে মেলায় যায় তাদের মাটির হাতি-ঘোড়া। ফেরে মলিন-শ্রান্ত হাতে।
চাহিদার সঙ্গে কমেছে শিল্পীর সংখ্যা। প্লাস্টিক-কাঁচের পণ্যে ঝুঁকেছে ক্রেতারা। তবে কিছু হাত এখনও গড়ছে মাটির হাঁড়ি-খেলনা।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভায় বসন্তপুর গ্রাম। একটি বাড়ির উঠানজুড়ে রাখা সারি সারি মাটির হাঁড়ি। পাশে রঙের বাটি-তুলি নিয়ে মগ্ন সুশান্ত কুমার পাল। বৈশাখ এসেছে বলে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম লুকিয়ে তার পরিবারে এখন উৎসবমুখর ব্যস্ততা।
বসন্তপুরের ‘পালপাড়া’ একসময় ছিল মৃৎশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। প্রায় প্রতিটি পরিবারই যুক্ত ছিল এই পেশায়। প্রজন্ম ধরে এখানে তৈরি হতো মাটির হাঁড়ি, পুতুল, মুখোশ, ঘোড়া, পাখি এমনকি বাঘ-সিংহের প্রতিকৃতিও। এখন এই শিল্প টিকে আছে সুশান্তের পরিবারে। তৈরি হচ্ছে কেবল শখের হাঁড়ি।
‘এখন আমাদের দম ফেলার সময় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছি। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার এসেছে, সেগুলো শেষ করতে পরিবারের সবাই মিলে কাজ করছি। বৈশাখ এলেই কিছুটা ভালো আয় হয়। কিন্তু সারা বছর যদি এমন কাজ থাকত, তাহলে এই শিল্পটা আরও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারত’- আক্ষেপ এই পরিবারের শিল্পী সঞ্চিতা রানী পালের।
প্রায় ৩৮ বছর ধরে মাটির শিল্প গড়ছেন সুশান্ত। জাপান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে নিয়ে গেছেন তার শিল্পকর্ম। প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়েও পেয়েছেন স্থান। অর্জন করেছেন লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের আজীবন সম্মাননাসহ নানা পুরস্কার। স্বীকৃতির গৌরব ছাপিয়ে তার চোখে-মুখে হতাশা।
‘এই শিল্প আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু টিকে থাকার মতো পৃষ্ঠপোষকতা পাই না। বাজার সীমিত, আয় অনিশ্চিত। এই অবস্থায় টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
বৈশাখী মেলা ধরতে ব্যস্ত শেরপুর সদরের বয়ড়া পালপাড়ার শিল্পীরা। ছয় মাস আগে থেকেই চলছে মাটির খেলনা গড়ার কাজ। এখন বসছে বাহারি রঙ। কদর কমলেও ঐতিহ্য টেকাতে অনড় এ গ্রামের প্রবীণ কারিগরেরা। নবীনরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।
‘এখন আমাদের পালদের দুর্দিন। সরকারও আমাদের সহযোগিতা করে না। আমরা বাপদাদার পেশা ধইরা রাখছি। কিন্ত আমাগো সন্তানরা আর এ পেশায় আইতাছে না। একসময় মাটির জিনিস আর থাকবো না’- অভিমানের সুর ষাটোর্ধ গোবিন্দ পালের।
একই শঙ্কা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার হিরন গ্রামের সবুজ পালের।
‘মাটির কাজে এখন আর পয়সা নাই। আমরা লেখাপড়া করি নাই, যে কারণে সংসার চালাতে বাধ্য হয়েই এ কাজ করতে হয়। আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে চাকরি করে। এই পেশার লোকজন দিন দিন কমে যাচ্ছে।’
মাটির শিল্পে কেবল ঐতিহ্য নয়, জড়িয়ে আছে আবেগও- জানালেন এই পালপাড়ার শিল্পীরা। প্রতিবছর বিক্রিতে হতাশা, তবুও পরের মেলায় হাতি-ঘোড়া-হাঁড়ি গড়ায় অভ্যস্ত তাদের হাত।
‘পহেলা বৈশাখের মেলায় শুধু নয়, বিভিন্ন মেলার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের মাটির খেলনা তৈরি করি। আগেকার বাচ্চা আর এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে তফাত আছে। এখনকার বাচ্চারা মাটির খেলনা কিনতে চায় না। বড়রা কিনে দিতে চাইলেও বাচ্চারা প্লাস্টিক বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে তৈরি খেলনা চায়। যে কারণে আমাদের ব্যবসায় দিন দিন ভাটির দিকে’- বললেন শিল্পী মনিকা পাল।
বৈশাখ ঘিরে এই শিল্পে কিছুটা প্রাণ ফেরে। বিভিন্ন মেলায় ২০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম ওঠে এসব পণ্যের। মেলা শেষে নিস্তেজ হয়ে পড়ে মৃৎশিল্পের বাজার। বিপণনের অভাব, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার ঘাটতি এবং নিয়মিত বাজার না থাকা এই শিল্পের বিকাশে বড় বাধা।
‘মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাওয়ায় প্লাস্টিক, কাঁচ ও আধুনিক পণ্যের ভিড়ে মাটির জিনিসপত্র হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে এই শিল্প এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে’- মত সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)- এর রাজশাহীর সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিনের।
মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখার আশ্বাস শোনালেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর কর্মকর্তারা। শিল্পীদের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে, জানালেন গোপালগঞ্জ বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এ.বি.এম রফিকুল্লাহ। আর বিসিক শেরপুরের ম্যানেজার মো. আতাউর রহমানের ঘোষণা- স্বল্পসুদে দেয়া হবে ঋণ।
প্রতিবেদনের তথ্য ও ছবি আগামীর সময়ের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান এবং শেরপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার প্রতিনিধিদের।





