বগুড়া
অনুমোদনহীন বহুতল ভবনের সংখ্যা নিয়ে জটিলতা

সংগৃহীত ছবি
বগুড়ায় বহুতল ভবনের সংখ্যা প্রতিনিয়মত বাড়ছে। এর মধ্যে কোনটি অনুমোদন আছে আর কোনটির নেই সেটি নিয়ে জটিলতায় পড়েছে প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশন। তৎকালীন পৌরসভা অথবা বর্তমান সিটি করপোরেশনের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের সমন্বয় না থাকায় এমন জটিলতা দেখা দিয়েছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের সূত্র মতে, হোল্ডিং নম্বর অনুযায়ী নগরীতে কাঁচা ও পাকা বসতবাড়ি রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার। এর মধ্যে বহুতল ভবন আছে অন্তত ৫’শ। এই বহুতল ভবনের মধ্যে কতগুলো নকশার অনুমোদন আছে তা জানে সিটি করপোরেশন।
করপোরেশনের ভাষ্য, গণপূর্ত বিভাগ নির্দেশনা অমান্য করে পৌরসভার আওতাধীন ভবনের অনুমোদন দিয়ে আসছে। কিন্তু বহুতল এসব ভবনের কোনো তালিকা বর্তমান সিটি করপোরেশনের নেই। একাধিকবার চেয়েও সেই তালিকা পায়নি করপোরেশনের লোকজন।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়টি পৌরসভা দেখতো। সে বছরের ২৫ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে প্রত্যেক জেলায় বিল্ডিং কন্সট্রাকশন (বিসি) কমিটি গঠন করতে বলা হয়। ৭ সদস্যের কমিটিতে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে ‘আহ্বায়ক’ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে ‘সদস্য সচিব’-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই প্রজ্ঞাপনের পর দেশের পৌরসভাগুলো ৭ তলার ( জি-৬) অধিক উচ্চতার ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এরপর ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। এতে পূর্ত মন্ত্রণালয় বিসি কমিটিতে আরও ২ জন সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
এই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টত বলা হয়েছিল, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার আওতাভুক্ত এলাকায় সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদন দিতে পারবে না বিসি কমিটি। এর ফলে সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের দায়িত্ব পুনরায় ফিরে পায় পৌর কর্তৃপক্ষ।
তবে অবাক করার বিষয় হলো, প্রজ্ঞাপন জারি হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুউচ্চ ভবনের অনুমোদনের কর্তৃত্ব নিজের দখলে রাখে বিসি কমিটি। ২০২৩ সাল থেকে একাধিকবার আপত্তি তুলে এসেছে তৎকালীন পৌরসভার মেয়র, নগর পরিকল্পনাবিদ।
সেসব আপত্তি ধোপে টিকেনি। গণপূর্ত বিভাগ জারি রেখেছে নিজেদের কর্তৃত্ব। আইন অমান্য করেই দিয়ে গেছে সুউচ্চ ভবনের অনুমোদন। ২০২৩ সালের নভেম্বর অন্তত ১৮টি সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদন দেয় গণপূর্ত।
২০১৯ সালের দিকে শহরের নিয়মবহিভূর্ত নকশায় নির্মাণ হয়েছে এমন ১০৪টি ভবনের তালিকা করেছিল বগুড়া পৌরসভা। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছিল সেই ভবনগুলোর নকশার অনুমোদন। ২০২৪ সালে আরও ২ ভবনের অনুমোদন বাতিল করেছিল তৎকালীন পৌরসভা। শুধু তাই নয়, বাতিল হওয়া ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ সংযোগ, ক্রয়-বিক্রয় বন্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও চিঠি দিয়েছিল তৎকালীন পৌরসভা।
এই তালিকার বিষয়টি নিশ্চিত করে সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মেহেদী হাসান জানালেন, ২০২৩ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পৌরসভার আওতাধীন এলাকায় ভবনের অনুমোদন দিতে পারে না গণপূর্ত বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বলার পরেও তারা আমাদের কথা শোনেননি। কয়েক মাস আগেও তালিকাও চাওয়া হয়েছে। সেটিও তারা দেয়নি।
মেহেদী হাসান বলেছেন, সিটি করপোরেশন হয়েছে। এখন এখানে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হবে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ভবনে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গণপূর্তের তালিকা পেলে আমরা বুঝতে পারব কোথায় কি অবস্থা হয়ে আছে।
বগুড়া গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে বগুড়ায় ৭ তলা বা ৭৫ ফুটের উপরের সুউচ্চ ভবনগুলোর অনুমোদন গণপূর্ত বিভাগ দিয়ে থাকে। এসব ভবনের নকশা সরেজমিন করে দেখা হয়। এরপর জেলায় কমিটির সভায় উত্থাপন করে অনুমোদন দেওয়া হয়। ঢাকা থেকেও অনেকে ভবনের নকশার অনুমোদন পাশ করে নিয়ে এসেছে। এই ভবনের নকশার অনুমোদন নিয়ে বিগত সময়ে তৎকালীন পৌরসভার সঙ্গে একাধিকবার ঝামেলা হয়েছে বলে গণপূর্তের প্রকৌশলীদের কাছে জানা যায়।
অনুমোদিত সংখ্যার বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হক বলেছেন, বিসি কমিটির হাতে প্রায় ১২৪ টির মতো ভবনের অনুমোদন হয়েছে। গত ২৩ জুন একটি পরিপত্র হয়েছে। সেটি পাওয়ার পর আমরা বগুড়া নগরের মধ্যে ভবনের অনুমোদন আর করছি না।
তালিকা হস্তান্তরের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বললেন, আমি নতুন এসেছি। বিগত সময়ের সমস্যা বলতে পারছি না। তাদেরকে তালিকা হস্তান্তর করার বিষয় আমার জানা নেই।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি মিলন রহমান জানালেন, বগুড়ায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মবহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তো পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের দেখার কথা। কিন্তু আইন যদি গণপূর্ত বিভাগকে বহুতল ভবনের অনুমোদন দেয়ার কথা বলে সেটাও মানতে হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পারছি এখানে পৌরসভা বা বর্তমান সিটি করপোরেশনের সঙ্গে গণপূর্তের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যেখানে সমন্বয়হীনতা বা তথ্যের লুকোচুরি থাকবে, বুঝতে হবে সেখানে অর্থনৈতিক অনিয়মও চলছে।





