কারখানার তরল বিষ খাল-নদীতে
সন্ধ্যা নামলেই খোলে দূষণের গোপন দুয়ার
- দিনে ইটিপি চালু রাখলেও খরচ বাঁচাতে রাতে বাইপাস লাইন দিয়ে ফেলা হয় বর্জ্য
- পানিতে মিশে থাকা লেড, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম প্রবেশ করছে ভূগর্ভস্থ পানিতেও
- ধ্বংস হচ্ছে জীবিকা, হুমকিতে জলজ ও প্রাণিজ সম্পদ
- বর্ষার স্রোতে কিছুটা আড়াল হয় দূষণ, শুষ্ক মৌসুমে বেরিয়ে আসে আসল রূপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। আড়ালে খোলে দূষণের গোপন দুয়ার। কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য গিলে খাচ্ছে গাজীপুরের খাল, বিল ও নদী। পরিশোধন ছাড়াই গড়িয়ে পড়ছে গাঢ় কালো, লালচে রাসায়নিক। বিষের তীব্রতায় নীল জনজীবন। বর্ষার স্রোতে কিছুটা আড়াল হয় দূষণ। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে বেরিয়ে আসে আসল রূপ।
টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও বিসিক এলাকার খালগুলোতে বইছে রাসায়নিকের ফেনা। স্বাভাবিক গতি আর নেই পানির। শুধু চিলাই নদী বা তুরাগ নয়, বিষ ছড়াচ্ছে আশপাশের সব জলধারায়। তুরাগ দূষণের উৎস রয়েছে অন্তত ২২৪টি। এর মধ্যে শুধু শিল্পকারখানাই ৫৪টি।
আইন অনুযায়ী, বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক। প্রায় ৬৮০টি ওয়াশিং কারখানায় তা বসানোও হয়েছে। কিন্তু খরচ বাঁচাতে রাতে বাইপাস দিয়ে ফেলা হয় অপরিশোধিত বর্জ্য। কারখানা মালিকদের কাছে ইটিপি চালনার খরচের চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা দেওয়া অনেক বেশি লাভজনক।
বিষাক্ত এই পানির প্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে কৃষি ও জীবিকা। জমিতে সেচ দিলে পুড়ে যাচ্ছে ফসলের চারা, উর্বরতা হারাচ্ছে মাটি।
বাসন বিল বা বাঘিয়া অঞ্চলের কৃষকরা এখন একসময়ের সোনা ফলানো জমিতে কোনো ফসল পান না। উধাও হয়ে গেছে নদীর মাছ। হাজারো মানুষ হারাতে বসেছে তাদের জীবিকা। পানিতে থাকা লেড, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু বিষিয়ে তুলছে ভূগর্ভস্থ পানিও।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদক যান টঙ্গী বিসিকের পূর্বদিকে শেষ সীমানা পাগাড় খেয়াঘাটের পাশে। সেখানে বড় একটি নালা দিয়ে বিসিকের পানি পড়ছিল তুরাগ নদে। নৌকার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন আনিসুর রহমান। তিনি বলছিলেন, ‘আগে এই নদীতেই গোসল করতাম, মাছ ধরতাম। এখন কাছে গেলেই এমন গন্ধ লাগে, দাঁড়ানো যায় না। পানিটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। নামার কথাও চিন্তা করা যায় না।’ গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল জুড়ে দিনের বেলায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও রাত নামলেই যেন খুলে যায় দূষণের গোপন দুয়ার। কারখানার পাইপ দিয়ে বের হতে থাকে কালো, লালচে ও রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য, যা খাল-নালা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে তুরাগ নদে।
অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ কারখানায় ইটিপি থাকলেও সেগুলো সচল রাখা হয় না। খরচ বাঁচাতে গভীর রাতে বাইপাস লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে খাল-নদীতে। টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কড্ডা, বাইমাইল, পুবাইল ও বিসিক শিল্প এলাকার বিভিন্ন খাল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পানির রঙ কুচকুচে কালো, কোথাও নীলচে বা লালচে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের পরিদর্শনে তুরাগ নদ দূষণের ২২৪টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্পকারখানা ৫৪টি, খাল-নালা ৪২টি, গৃহস্থালি ও অন্যান্য ১১৫টি এবং হাট-বাজার ১৩টি। সংগঠনটি বলছে, এক নদীর দূষণ অন্য নদীতেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে সামগ্রিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থাই পড়ছে ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ মুহাম্মদ মনির হোসেন বললেন, ‘গাজীপুরের নদনদীগুলো ধারাবাহিকভাবে দূষিত হচ্ছে। এক নদীর দূষণ অন্য নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে, এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত হচ্ছে। পানিতে লেড, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা বেড়ে মানবদেহ ও জলজ প্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।’
‘এ অঞ্চলে চর্মরোগ, ব্রংকাইটিস ও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কারখানায় ইটিপি স্থাপন ও নিয়মিত চালনা নিশ্চিত করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। গাজীপুর দূষণে সংকটাপন্ন হলে ঢাকাও এর প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না। কারণ এটি রাজধানীর উজানের অঞ্চল’— যোগ করলেন মনির হোসেন।
গাজীপুরে রয়েছে প্রায় দুই হাজারের বেশি পোশাক ও শিল্পকারখানা। এর মধ্যে প্রায় ৬৮০টি ওয়াশিং কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হলেও বাস্তবে অনেকগুলোই অচল। অনেক মালিক খরচ বেশি হওয়ায় ইটিপি চালাতে অনীহা দেখান। ফলে গোপনে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ফেলে দেওয়া হচ্ছে খালে। দূষিত পানির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিও। কৃষকরা জানালেন, খালের পানি সেচে ব্যবহার করলে কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা। গাজীপুর মহানগরীর বাসন এলাকার নৌকাচালক ফজলুল হকের কণ্ঠে ঝরল একরাশ হতাশা। বললেন, ‘আগে বাসন বিলে প্রচুর মাছ হতো, সারা বছর এ বিলের ধানের ফসল দিয়ে সংসার চলত। এখন ঠিকমতো ধানের উৎপাদন হয় না। বর্ষায় কিছু মাছ পাওয়া গেলে শুষ্ক মৌসুমে নদী ও বিলে কোনো মাছ থাকে না। অনেক জমি পতিত হয়ে পড়ে থাকে।’
বাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘খালের পানি আগে আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল, এখন অভিশাপ হয়ে গেছে। এই পানি দিয়ে সেচ দিলে গাছের পাতা পুড়ে যায়, অনেক সময় চারা নষ্ট হয়ে যায়। বড় ঝুঁকিতে থাকে মাছের খামারগুলো। আর জমিতে ফসলের উৎপাদন অনেক কমে গেছে।’
দূষণে জীবিকা হারাতে বসেছেন বাঘিয়া এলাকার কৃষক হান্নান মিয়া। তার ভাষ্য, ‘বাড়ির পাশে নিচু জমিতে আগে বছরে দুটি ফলন হতো, কিন্তু এখন কিছুই করতে পারছি না। আশপাশের কারখানার কালো পানির কারণে মাটি নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কিছু লাগালেও ফসল ঠিকমতো বড় হয় না। সেখানকার পানি এখন পুরো বিষের মতো লাগছে।’
কারখানা কর্তৃপক্ষ ইটিপি চালানোর পরিবর্তে জরিমানা দেওয়াকেই সুবিধাজনক মনে করে বলে মত গাজীপুর বারের আইনজীবী মো. দেলোয়ার হোসেনের। তিনি বললেন, ‘নদী ও পরিবেশ দূষণের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করে। জরিমানা দেওয়ার পরের দিন ফের দূষণে নেমে পড়ে কারখানাগুলো। এক মাস ইটিপি বন্ধ করে যে পরিমাণ টাকা সাশ্রয় হয়, তার পরিবর্তে দু-তিন মাস পরপর জরিমানা দিলেও কারখানার কোনো সমস্যা হয় না। বারবার জরিমানা আদায় করলেও উৎপাদনমুখী কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না পরিবেশ অধিদপ্তর।’ গাজীপুরে শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানালেন বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) গাজীপুর মহানগরীর সভাপতি হাসান ইউসুফ খান। তার ভাষ্য, অধিকাংশ কারখানায় ইটিপি থাকলেও তা নিয়মিত চালানো হয় না। এখনই কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ না করলে খাল-নদীগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
দূষণ নিয়ন্ত্রণে না থাকার অভিযোগ স্বীকার করলেন গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফীন বাদল। বললেন, ‘অভিযোগ পেলে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। অনেক কারখানায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তবে সব কারখানাকে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।’





