শিবচরে ভিন্ন পেশার মানুষ পাচ্ছেন সরকারি সহায়তা, বঞ্চিত জেলেরা

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা মাছ শিকার। ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত চরজানাজাত ইউনিয়নে সরকারি জেলে সহায়তার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পেশায় জেলে নন এমন অনেক ব্যক্তি কার্ড পেয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। অন্যদিকে, বছরের পর বছর পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক মৎস্যজীবী এখনো তালিকার বাইরে। এমনকি এক জীবিত জেলেকে সরকারি নথিতে ‘মৃত’ দেখিয়ে সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নদীঘেরা এই জনপদের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকা মাছ শিকার। বছরের অধিকাংশ সময় পদ্মায় মাছ ধরে সংসার চালান স্থানীয় জেলেরা। কিন্তু মাছের সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে এসব পরিবারের আয়-রোজগারও থেমে যায়। তখন সরকারি সহায়তা হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ভরসা। অথচ সেই সহায়তা থেকেই বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত রয়েছেন প্রকৃত মাছশিকারীদের অনেকে।
এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, জেলে কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেদের সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও কার্ড মেলেনি। আবার প্রকৃত জেলে না হয়েও কেউ কেউ কীভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্ড পেতে গিয়ে অনেককেই নানা ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে।
মো. সেলিম নামের এক জেলে জানান, প্রায় ১৮ বছর ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। মাছ ধরাই তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বছরের পর বছর এই পেশায় থাকলেও এখনো জেলে কার্ড পাননি তিনি।
তিনি বললেন, ‘যারা বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের নাম যদি তালিকায় না থাকে, তাহলে জেলে কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা আসলে কী?’
স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব জানান, তার বাবা ছিলেন পেশাদার মৎস্যজীবী। বাবার জীবদ্দশায় তিনি কখনো জেলে কার্ড পাননি। বাবার মৃত্যুর পর একই পেশা ধরে রেখেছেন তিনি। কিন্তু তিনিও এখন পর্যন্ত কার্ডের সুবিধা পাননি।
ভুক্তভোগী রহিম মাদবরের অভিযোগ, জেলে কার্ড পাওয়ার আশায় স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে কয়েক দফা নাগরিক সনদ ও ছবি জমা দিয়েছেন তিনি। চার-পাঁচবার কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তার হাতে কার্ড আসেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে জানিয়েছেন, তিনি আগে নিয়মিত জেলে কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পেতেন। কিন্তু দুই বছর ধরে হঠাৎ তার সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। এর কারণ জানতে সরকারি নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রেকর্ডে তাকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।
ওই জেলের অভিযোগ, সরকারি নথিতে তাকে মৃত দেখানোর ঘটনায় তিনি বিস্মিত। কীভাবে এমন ভুল হলো এবং কার মাধ্যমে তার তথ্য পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, চরজানাজাত ইউনিয়নে জেলে কার্ডের তালিকা নতুন করে যাচাই করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে যারা ছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জেলে পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের কার্ড বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া সরকারি নথিতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানোর অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত চান স্থানীয়রা। কারও গাফিলতি বা অনিয়মের কারণে যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু কাগজপত্রের ভিত্তিতে নয়, মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে যাচাই করে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করা হবে।
চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট নাসির উদ্দিন বেপারী বলেছেন, ‘বছরের পর বছর পদ্মায় মাছ শিকার করে যারা পরিবার চালান, সরকারি সহায়তার প্রকৃত দাবিদার তারাই। তাই আমাদের দাবি হলো জেলে কার্ডের তালিকা পুনঃযাচাই করে অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের দ্রুত সরকারি সহায়তার আওতায় নেওয়া।’
অভিযোগের বিষয়ে শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বললেন, ‘প্রকৃত জেলে নন এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যাদের কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা নেই, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।’
প্রকৃত মাছশিকারীরা যাতে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তালিকার বাইরে থাকা জেলেদের শনাক্ত করে তাদের তালিকাভুক্ত করার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইএইচএম ইবনে মিজান জানিয়েছেন, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং যারা জেলে নন, তারা জেলে কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন, এমন অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। এ বিষয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






