রাজশাহী
ট্রাকচাপায় আহত সাংবাদিক পরিবারের ৫ সদস্য প্রাণশঙ্কায়

ছবি: আগামীর সময়
এক মুহূর্তেই যেন ওলটপালট হয়ে গেছে একটি পরিবারের জীবন। যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের খবর তুলে ধরেন, আজ তিনিই হাসপাতালের করিডোরে ছুটছেন নিজের বাবা-মা, দুই বোন ও দেড় বছরের ভাগ্নির জীবন বাঁচানোর জন্য।
রাজশাহীর এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা স্থানীয় সাংবাদিক মো. আমানুল্লাহ আমানের পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তা আর গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে।
সম্প্রতি রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের মোহনপুর উপজেলার খয়রা মোড়ে বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক যাত্রীবাহী মাহিন্দ্রাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন এক যাত্রী। একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন সাংবাদিক আমানের পরিবারের পাঁচ সদস্য। তারা সবাই এখন চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে বাবার অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক।
মোহনপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আতাউর রহমান ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত ব্যক্তি আব্দুল মান্নান শাহ (৫৫)। তিনি মোহনপুর উপজেলার ধুরইল এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় রিকশাচালক ছিলেন।
আহতরা হলেন- সাংবাদিক আমানের বাবা আলহাজ মাওলানা মো. সাদেকুল আলম (৫৫), মা মোছা. জায়েদা বেগম (৪৫), ছোট দুই বোন ফাহমিদা খাতুন (২৩) ও জাকিয়া তাবাসসুম (৮) এবং ১৭ মাস বয়সী ভাগ্নি আয়েশা সিদ্দিকা।
পুলিশ জানায়, গত ২৮ জুন রাত ১০টার দিকে রাজশাহী থেকে মোহনপুরগামী একটি মাহিন্দ্রাকে বিপরীত দিক থেকে আসা রাজশাহীগামী একটি ট্রাক রং সাইডে উঠে সরাসরি চাপা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ট্রাকটি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাহিন্দ্রার ওপর উঠে যায়। মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় যাত্রীবাহী যানটি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, মাহিন্দ্রাটি নিজের লেনেই চলছিল। চালকের কোনো ভুল ছিল না। কিন্তু ট্রাকের অতিরিক্ত গতি ও রং সাইডে উঠে আসার কারণে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। সংঘর্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেকেই মনে করেছিলেন মাহিন্দ্রার কেউ বেঁচে থাকার কথা নয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সাদেকুল আলমের দুই পা ভেঙে গেছে। ডান পায়ের ওপেন ফ্র্যাকচার অত্যন্ত জটিল। মাথায় ১৪টি এবং হাতে ৪টি সেলাই লেগেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ইতোমধ্যে তাকে পাঁচ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।
মা জায়েদা বেগমের একটি পা ভেঙেছে। ছোট মেয়ে জাকিয়া তাবাসসুমের দুই পা ভেঙে গেছে, কপালেও সেলাই লেগেছে। ফাহমিদা খাতুন হাঁটুর জয়েন্ট ও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। আর মাত্র ১৭ মাস বয়সী আয়েশা সিদ্দিকার বুকের ওপরের হাড় ভেঙে গেছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে তাদের স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আরও একাধিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে। চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এমনকি রাজশাহীতে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া নিয়েও রয়েছে সীমাবদ্ধতা।
এদিকে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সাংবাদিক আমানুল্লাহ আমানের। তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা মেইল-এর রাজশাহী প্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাইট লাইফ ভলান্টিয়ার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, বাবার চিকিৎসা নিয়ে বুধবার (২৯ জুলাই) সারাদিন চরম অনিশ্চয়তায় কাটাতে হয়েছে। অর্থোপেডিক বিভাগ ও বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমতের কারণে বাবার পরবর্তী চিকিৎসা শুরুই করা যায়নি।
তিনি জানালেন, প্রথম অস্ত্রোপচারে বাম পায়ের ভেতরে রড এবং ডান পায়ে এক্সটার্নাল ফিক্সেটর লাগানো হয়েছে। কিন্তু ডান পায়ের ওপেন ফ্র্যাকচার অত্যন্ত জটিল। হাড়ের মাঝখানে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে। ভাঙা অংশের ওপরের মাংসও উঠে গেছে।
আমান বললেন, অর্থোপেডিক বিভাগ ক্ষতস্থানে আগে মাংস প্রতিস্থাপনের জন্য বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে পাঠায়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা জানালেন, আগে হাড়ের সংযোগ ঠিক না করলে মাংস প্রতিস্থাপন করলে পরবর্তীতে পচন ধরতে পারে। আবার অর্থোপেডিক বিভাগে ফিরে গেলে তারা আগের অবস্থানেই অনড় থাকেন। এভাবেই দুই বিভাগের বিপরীত সিদ্ধান্তের মধ্যে সারাদিন কেটে যায়। অথচ বাবার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে যায়।
তার ভাষায়, 'আমি প্রতিদিন মানুষের খবর করি। কিন্তু আজ নিজের পরিবারের জন্য হাসপাতালের এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে ছুটে বেড়াচ্ছি। মা, বাবা, দুই বোন আর ছোট্ট ভাগ্নির জীবন নিয়ে এখন শুধু দুশ্চিন্তাই সঙ্গী।'
মোহনপুর থানার এসআই আতাউর রহমান বলেছেন, দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। নিহতের পরিবারের করা মামলার তদন্ত চলছে। ঘাতক ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




