১৪ কোটি টাকার সড়কে ঢালাই শেষেই ফাটল!

রাস্তার ফাটল দেখোচ্ছেন স্থানীয় ব্যক্তি
দীর্ঘদিনের খানাখন্দ পেরিয়ে নতুন সড়কের অপেক্ষায় ছিলেন রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার মানুষ। তাদের সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার কথা ছিল ১৪ কোটি টাকার একটি পুনর্বাসন প্রকল্পে। কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু নতুন সড়কের ঢালাই শেষ হওয়ার পরই দেখা দিয়েছে ফাটল। কোথাও আবার সড়ক দেবে গেছে।
নির্মাণকাজ শেষের আগেই এমন চিত্র দেখে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। উঠেছে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন। তবে পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলীর দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মানে কোনো সমস্যা নেই। মূল সমস্যা সড়কের নিচের মাটিতে।
তার ভাষ্য, সড়কের নিচের মাটি ‘অর্গানিক সয়েল’। পানি পেলে এই মাটির ভার বহনের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের অংশের ভার নিতে না পেরে মাটি দেবে যায়।
প্রকল্পের নথি বলছে, ‘বায়া-কাশিম বাজার-তানোর সড়ক পুনর্বাসন কাজ (প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ)’ প্রকল্পের আওতায় ৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। কাজ শুরু হয়েছে গত ৯ মে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৭ সালের ১২ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে পবা উপজেলার বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন অংশে পুনর্বাসনের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় সড়কের কয়েকটি অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। সেই ঢালাইয়ের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে ফাটল। সেসব অংশে বন্ধ রেখে অন্য অংশে নির্মাণকাজ চলছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কুরবান আলী বলেছেন, ‘সড়কের কিছু অংশে অপরিষ্কার জায়গার ওপরই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। নিচের মাটিও ভালোভাবে শক্ত করা হয়নি।’
বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজমুল হুদা মোল্লার অভিযোগ- ‘গর্ত খননের পর মাটি ভালোভাবে কমপ্যাক্ট করা হয়নি। রোলার না চালানোর কারণে সড়কের এক পাশে দেবে গেছে। অন্য পাশে দেখা দিয়েছে ফাটল।’
কাজের মান ৫০ শতাংশও হয়নি দাবি করে তার অভিযোগ, ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। ঢালাইয়ে বালু বেশি এবং খোয়া কম ব্যবহার করা হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বললেন, ‘সড়কের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় প্রকল্পের নকশা সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।’ মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি, বৃষ্টির পানি এবং ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কের কাঠামো আরও মজবুত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের পাশাপাশি ১২ ইঞ্চি আরসিসি করার কথা বলা হয়েছে। এতে দুই স্তরের রডের জালি এবং কর্নার বার বা কর্নার রড দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি জানেন। তারা সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেও গেছেন বলে জানান মোহাম্মদ আলী।
তার দাবি, নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ইলেকট্রনিক্সের ঠিকাদার মো. ইউনুস আলীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে সড়কের নিচের মাটির বিষয়টি। তবে তার ব্যাখ্যায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে এসেছে।
‘ঢালাই দেওয়ার পর অন্তত ২৮ দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা দরকার ছিল। কিন্তু সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করেছে।’ তার মতে, এতে সদ্য ঢালাই করা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
তবে ইউনুস আলীও স্বীকার করেছেন, ওই এলাকার মাটির বেস ভালো নয়। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার বিষয়ে তাদের আপত্তির কথাও সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।



