রাত নামলেই চুরি: সংকটে সম্ভাবনাময় রাবার শিল্প

ছবি: আগামীর সময়
পাহাড়ঘেরা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছিল রাবারশিল্প। বিস্তীর্ণ পাহাড়ে গড়ে উঠেছে শত শত রাবার বাগান। তৈরি হয়েছে কারখানা কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র। গত কয়েক বছর থেকে রাত নামলেই একের পর এক বাগানে ঢুকে রাবার চুরির ঘটনা সেই সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে সংকটে ফেলেছে।
বাগান মালিকদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চোরচক্র বিভিন্ন বাগান থেকে রাবার চুরি করে স্থানীয় ও বাইরের কিছু ক্রেতার কাছে বিক্রি করছে। বারবার স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতে চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না প্রতিকার। এমন অবস্থায় চোরাই রাবারের বাজার চলমান থাকায় চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
রাবার বাগান মালিকরা অভিযোগ করেন, এ রাবার চোর সিন্ডিকেটের দাপটে বৈধভাবে ব্যবসা করা মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, রাবার শিল্পের এমন ঝুঁকিতে হুমকিতে পড়ছে বাগানের শ্রমিক, পরিবহনকর্মী প্রক্রিয়াজাতকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাইশারীসহ নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় ৭৬৫টি রাবার বাগান রয়েছে। এসব বাগানের আওতায় প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার একর জমি শিল্পীজাত পণ্য চাষের আওতায় এসেছে।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নাইক্ষ্যংছড়ির রাবার শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক ও অন্যান্যরা যুক্ত।
তবে চুরি, চোরাই রাবারের কেনাবেচা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির অভিযোগে শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানালেন, এরই মধ্যে গাজী গ্রুপ ও মেসার্স বায়েজিদ রাবার প্রসেসিং প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
পাহাড়ি বাগান, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাইশারীর বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় রাবারবাগান। রাতের বেলায় এসব বাগানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও নজরদারি নেই। বাগান মালিকরা বলছেন, বিস্তীর্ণ পুরো এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন সম্ভব নয়।
রাবার বাগান মালিকরা জানালেন, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধচক্র বাগানে ঢুকে রাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
বাইশারীর রাবারবাগান মালিক আলী মো. মিনহাজ বলেছেন, একটি বাগান থেকে রাবার চুরি হলে শুধু মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এর সঙ্গে শ্রমিক পরিবহনকর্মী স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রক্রিয়াজাতকারী ও বিপণনকারীরাও ক্ষতির মুখে পড়েন। চুরি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়বে।
বাইশারী রাবার মালিক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ রফিক বশরী বললেন, বাইশারীর বিভিন্ন বাগান থেকে নিয়মিত রাবার চুরি হচ্ছে। চোরাই রাবার একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বাগান মালিকরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।
তিনি চোরাই রাবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বাগান এলাকায় রাতে পুলিশের টহল বাড়ানো এবং চোরাই রাবারের পরিবহন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ট্রাকে রাবার নেওয়ার অভিযোগ
মেসার্স বায়েজিদ রাবার প্রসেসিং প্ল্যান্টের মালিক আবদুর রহিম মনু বলেছেন, রাবার শিল্পের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বহু শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জড়িত। চুরি অব্যাহত থাকলে বাগান মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সংকুচিত হবে।
তিনি আরও জানান, তার কারখানা থেকে ট্রাকে করে রাবার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মামলা করা হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এতে চোরচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পরিস্থিতির চাপ সইতে না পারায় তার কারখানাসহ দুটি কারখানা ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
বাগান মালিক আলী মিনহাজ বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি না থাকায় চোরচক্র সুযোগ পাচ্ছে। তার দাবি, কোনো ব্যক্তি অভিযোগ করার পরই অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যায়। নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা থাকলে চুরি ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম বলেছেন, বিভিন্ন রাবার বাগান থেকে বহিরাগতরা রাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চুরির ঘটনায় কয়েকটি মামলাও হয়েছে। রাবারশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই জনপ্রতিনিধি।
শুধু চোর ধরলেই হবে না
বাগান মালিকদের অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চোরাই রাবারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভূমিকা। তাদের মতে, চুরি করা রাবারের বাজার না থাকলে চোরচক্র এতটা সক্রিয় হতে পারত না।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাইশারীতে কিছু ছোট খুচরা রাবার ক্রেতা রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে রাবার সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাই রাবারের সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করতে শুধু চোর ধরলে হবে না। এর সঙ্গে জড়িত ক্রেতা, মজুতদার, পরিবহনকারী ও বড় পরিসরের বিক্রেতাদেরও শনাক্ত করা প্রয়োজন।
কয়েকজন বাগান মালিক অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বা তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে চোর সিন্ডিকেটের সম্পর্ক থাকার কারণে চুরি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
বড় বাগানেও চুরির অভিযোগ
বাগান মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাইশারীতে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বড় আকারের রাবার বাগান রয়েছে। এর মধ্যে পিএইচপি গ্রুপ, প্রফেসর গ্রুপ, গাজী গ্রুপ, ফোর এইচ গ্রুপ, ডাক্তার গো হাউস, ডাক্তার গালিফ ও মেজর জেনারেল রাবারের বাগান রয়েছে। বাগান মালিকদের অভিযোগ, বড় বাগানগুলোর কয়েকটিতেও চুরির ঘটনা ঘটছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান বলেছেন, রাবার চুরি এবং অবৈধ বাজারের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবহিত নন। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক মঞ্জুর আহসান জানান, রাবার চুরির ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কয়েক দশকের শিল্প, এখন নতুন চ্যালেঞ্জ
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাবার চাষের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে উচ্চভূমি বন্দোবস্তীকরণ প্রকল্পের আওতায় ১৯৮০ সাল থেকে তিন দফায় বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় প্রায় ১৩ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিকে রাবার চাষ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। পরে বেসরকারি উদ্যোগেও রাবার বাগানের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
সূত্র জানায়, ২০০০ সালের পর এ খাতের বিস্তার আরও সম্প্রসারিত হয়। বেশ কয়েকটি বড় ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা রাবার শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
কয়েকজন বাগান মালিক বলেছেন, উৎপাদন বাড়লেও রাবারের পরবর্তী ধাপ, বিশেষ করে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য তৈরির সক্ষমতা এখনো সীমিত। স্থানীয়ভাবে রাবার প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলেও টায়ার ও বিভিন্ন রাবারজাত পণ্য তৈরির মতো শিল্প অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মত প্রকাশ করেছেন।
তারা বলেন, কাঁচামাল হিসেবে রাবার উৎপাদন করে শুধু বিক্রি না করে দেশে পূর্ণাঙ্গ রাবারভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে এ খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাগান মালিক জানান, প্রতিবছর দুই দফা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও এর বাইরে তারা তেমন আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা পান না। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের লাঞ্চ ও ভাতা হিসেবে প্রায় ৫০০ টাকা দেওয়া হয় বলে তারা জানান।
নিরাপত্তা ও সরকারি সহায়তা চান মালিকেরা
বাগান মালিক কামরুল হাসান বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে রাবার চাষ সম্প্রসারণের জন্য রাবার চুরি প্রতিরোধের পাশাপাশি বাগানের নিরাপত্তা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রাবারজাত শিল্প স্থাপনে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে বৈধ ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রাবার বিক্রির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বাগান মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাবার শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ নির্ভরশীল। বাগানের শ্রমিক থেকে শুরু করে পরিবহন প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে এ শিল্প কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
বাগান মালিকেরা বলছেন, চুরি ঠেকাতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং এক পর্যায়ে বাগান পরিচালনা অলাভজনক হয়ে পড়তে পারে। এতে রাবার উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পুরনো বাগান পরিত্যক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন অবস্থায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় পড়বেন।
স্থানীয় রাবার বাগান শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, অনেক বছর ধরে আমরা এই বাগানে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। রাবার চুরি বাড়তে থাকলে বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব আমাদের ওপরও পড়ে। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি দরকার।
সোলতান আহমেদ বলেন, রাবার বাগান ও কারখানাগুলো চালু থাকলে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। চুরি ও অব্যবস্থাপনার কারণে যদি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, উৎপাদন
প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণন ব্যবস্থা আধুনিক করা গেলে দেশের রাবারের চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব। তবে এর আগে বাগানের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চোরাই রাবারের বাজার বন্ধ করা জরুরি।
বাগান মালিকদের একাধিক সূত্র জানায়, শুধু রাতের বেলায় পাহারা বসিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। চুরি সংঘটনের পর চোর ধরার পাশাপাশি চোরাই রাবারের ক্রেতা, মজুদদার ও সরবরাহব্যবস্থার মূল হোতাদের শনাক্ত করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বাগানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি কঠিন হলেও পুলিশ, প্রশাসন, বাগান মালিক ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
রাবার চোরচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চোরাই রাবার বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বাগান এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং রাবারশিল্পে সরকারি সহায়তা বাড়ানো না হলে বাইশারীর সম্ভাবনাময় এ শিল্প একের পর এক সংকটে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বাগান মালিক ও ব্যবস্থাপকরা।



