দুই ছাগল বদলে দিল রিংকুর জীবন

সরকারি অনুদানে পাওয়া দুটি ছাগলই বদলে দিয়েছে রিংকুর ভাগ্য- আগামীর সময়
অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। স্বামীর সামান্য আয়ে চার সদস্যের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাত। জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস, ছেলের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম— সব মিলিয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটছিল কোটালীপাড়ার নারিকেলবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ রিংকু বৈদ্যের (৩২) পরিবারের।
কিন্তু সরকারি অনুদানে পাওয়া মাত্র দুটি ছাগলই বদলে দিয়েছে ভাগ্য। দুই ছাগল থেকে এখন হয়েছে ১৩টি ছাগল। এর মধ্যে কোরবানির ঈদে আটটি ছাগল বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা আয় করেছেন রিংকু। সেই টাকা দিয়ে তিনি নির্মাণ করছেন নতুন ঘর। ধীরে ধীরে অভাব কাটিয়ে সচ্ছলতার পথে হাঁটছে পরিবারটি।
রিংকু বৈদ্যের স্বামী অমল বৈদ্য পেশায় একজন জেলে। মাছ ধরে কোনো মতে সংসার চালালেও সামান্য আয় দিয়ে স্ত্রী, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে দিনাতিপাত করা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।
নিজের জীবনের এই পরিবর্তনের গল্প শুনিয়ে রিংকু বৈদ্য বললেন, ‘বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সংসারে অভাব-অনটন ছিল। স্বামী মাছ ধরে যা আয় করতেন, তা দিয়ে সংসার চলত না। আমিও দিনমজুরের কাজ করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই দারিদ্র্য দূর করতে পারিনি। গত বছরের জুলাই মাসে মৎস্য অফিস থেকে দুটি উন্নত জাতের ছাগল পাই। যত্ন করে পালন করার ফলে ২২ মাসে দুটি ছাগল থেকে ১৩টি হয়েছে। আটটি বিক্রি করে নতুন ঘর তুলছি। এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি।’
বর্তমানে তার খামারে পাঁচটি ছাগল রয়েছে। এগুলো কেন্দ্র করে আগামীতে বড় একটি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ছাগলগুলোর জাত অত্যন্ত ভালো উল্লেখ করে অমল বৈদ্য জানান, মাত্র পাঁচ-ছয় মাসেই একটি ছাগলের ওজন ছয় থেকে আট কেজি হয়ে যায় এবং এগুলো সহজেই বাজারে বিক্রি করা যায়। ছাগল পালনের সুফল তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘ছাগল পালনের কারণে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। এ সময় দিনমজুরি ও ছাগলের পরিচর্যা করে সংসার চালাই। আমার মতো এলাকার অনেক জেলেই এখন প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন। এতে খাল-বিল ও জলাশয়ে দেশীয় মাছের উৎপাদন বেড়েছে। মাছ ধরার মৌসুমে এখন আগের চেয়ে বেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে।’
অমল বৈদ্যের এই সাফল্যের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রতিবেশী পরিমল হালদার ও দুলাল হালদার মন্তব্য করেন, একসময় অমলের পরিবারে চরম অভাব ছিল, তবে ছাগল পালন শুরু করার পর রিংকুর কঠোর পরিশ্রমে তাদের অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
একই গ্রামের শ্যামল কুমার রায় দাবি করেন, সরকারের দেওয়া গরু-ছাগল পালন করে এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারই এখন দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে।
মৎস্য বিভাগের এই উদ্যোগের বিষয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুমে জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হিসেবে গোপালগঞ্জের ৮০০ দরিদ্র জেলে পরিবারের মধ্যে ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। ছাগল পালন করে পরিবারগুলো বাড়তি আয়ের সুযোগ পাওয়ায় তারা প্রজনন সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে, যার ফলে স্থানীয় খাল-বিল ও জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে যে একটি দরিদ্র পরিবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, রিংকু বৈদ্যের এই গল্প তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।




