স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাপের বসতবাড়ি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় এক যুগ ধরে চিকিৎসাসেবা নেই লক্ষ্মীপুরের কুশাখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। চিকিৎসক-নার্সের অভাবে কার্যত বন্ধ পড়ে থাকা কেন্দ্রটির ভবনও এখন জরাজীর্ণ। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল, বেড়েছে সাপ-পোকামাকড়ের উপদ্রব। অথচ প্রতিদিন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এ কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করার কথা ছিল ইউনিয়নের হাজারো মানুষের। সেবা না পেয়ে তাদের ছুটতে হচ্ছে দূরের হাসপাতালগুলোতে।
কুশাখালী ইউনিয়নের শান্তিরহাট বাজারে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থান। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত তালা ঝুলতে দেখা গেছে কেন্দ্রটির মূল ফটকে। স্থায়ী চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এখান থেকে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়া যায় না। ফলে অসুস্থ হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের যেতে হয় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল কিংবা পাশের জেলা নোয়াখালীর বিভিন্ন হাসপাতালে। এতে চিকিৎসার জন্য তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশে তৈরি হয়েছে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল। ফাটল দেখা দিয়েছে ভবনের বিভিন্ন স্থানে। কোথাও কোথাও খসে পড়েছে দেয়াল ও পলেস্তারা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের ভেতরেও রয়েছে অযত্নের ছাপ। আশপাশে সাপ ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের বিচরণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, জরাজীর্ণ ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়লে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও বলেছেন, ইউনিয়নের মানুষের জন্য এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কাছাকাছি একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রয়োজন। কিন্তু কেন্দ্রটি নিয়মিত চালু না থাকায় তাদের দূরের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে অনেক দরিদ্র পরিবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদ বললেন, ‘এখানে চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। এখন একজন চিকিৎসক সপ্তাহে এক দিন আসেন। প্রতিদিন অনেক নারী চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে যান। দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করা দরকার।’
আরেক বাসিন্দা মাহবুবর রহমান বলেছেন, ‘এখানে রোগীরা কোনো সেবা পাচ্ছেন না। ভবনের দেয়াল ও পলেস্তারা খসে পড়ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পুরো জায়গাটি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। সেখানে সাপের উপদ্রবও রয়েছে। ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও এর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটি এখন নষ্ট হওয়ার পথে। তারা দ্রুত সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন।
তবে লক্ষ্মীপুরের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুল হাসান বলেছেন, লক্ষ্মীপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগ ভবন ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত। দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে অনেক কেন্দ্রের ভবন। কুশাখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বর্তমানে একজন মেডিকেল অফিসার পদায়ন করা হয়েছে। তিনি সেখানে সেবা দিচ্ছেন। শিগগিরই একজন নার্সও যোগ দেবেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাজমুল হাসান আরও বললেন, লক্ষ্মীপুরের আটটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কুশাখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেও একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হবে। নতুন ভবন হলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক ও নার্স পদায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দাবি, দ্রুত এসব ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আবার স্থানীয় মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার ভরসাস্থলে পরিণত হতে পারে।




