৬ মাসে ৬৫ হত্যা, পুলিশ-র্যাবের ওপর ৯ হামলা নারায়ণগঞ্জে

চাষাড়া গোলচত্বর এলাকার বিজয় স্তম্ভ। ছবি: আগামীর সময়
জেল খাটতে কেমন লাগে— সেই অভিজ্ঞতা নিতে ফুলবিক্রেতা ১১ বছরের হোসাইনকে হত্যা করে স্থানীয় কয়েক কিশোর। বেশ আলোচিত হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গত ২৫ এপ্রিলের এ ঘটনা। ফতুল্লাতেই পরের মাসের ২২ তারিখ বিকালে ছয় বছরের শিশুর ধর্ষক সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় হিরু নামের যুবককে। গত ১৬ জানুয়ারি রূপগঞ্জে ছুরিকাঘাতে হত্যার শিকার হন আমেনা বেগম। সন্দেহভাজনকে পরে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা।
চলতি বছরের শুরু থেকেই এমন একের পর এক হত্যাকাণ্ডের খবরে আতঙ্কিত নারায়ণগঞ্জবাসী। ঘরে, ডোবায়, রাস্তায় মিলছে মরদেহ। আবার স্থানীয় লোকজন পিটিয়ে মারছেন সন্দেহভাজনদের। হামলায় আক্রান্ত হচ্ছেন খোদ পুলিশ-র্যাব সদস্যরা। সবমিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেহাল— বলছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
জেলা পুলিশের হিসাবে, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে ৬৫টি হত্যাকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা হয়েছে ৯ বার। এর মধ্যে গত ৪ জুলাই আসামি গ্রেপ্তারে গিয়ে সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার এলাকায় হামলায় আহত হন পুলিশের এসআই নুরুজ্জামান মিয়া, কনস্টেবল শাহীন ও মাসুম মিয়া।
ফতুল্লার মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় ১৩ জুন মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলায় আহত হন পুলিশের পাঁচ সদস্য। ৫ মে শহরের মাসদাইর বোয়ালিয়াখাল এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারে যাওয়া র্যাবের তিন সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে মাদককারবারিরা। এ ছাড়া গত মার্চ ও মে মাসের তিনটি ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার পর ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাদের অস্ত্র, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ।
এই ৬ মাসে পুলিশেরও অপরাধসংশ্লিষ্টতার ঘটনা সামনে এসেছে। গত ৪ জুলাই ফতুল্লায় অভিযানের নামে স্বর্ণ চুরির ঘটনায় বরখাস্ত হন এসআই খায়রুল বাশার ও কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯ জুন রূপগঞ্জে এক যুবককে অপহরণচেষ্টার অভিযোগে অব্যাহতি দেওয়া হয় চারজনকে। তারাও হন গ্রেপ্তার।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সন্ত্রাসীরা এখন ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তি। ড্রোন ও উন্নত সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজর রাখা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধির ওপর। কোনো এলাকায় পুলিশ প্রবেশ করলেই দ্রুত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে অপরাধীরা।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ঢাকা বিভাগ সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুমের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে এই পরিস্থিতি। আবার বাহিনীর ওপর হামলায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।
তিনি মনে করেন, ‘সৎ ও সুশৃঙ্খল হলে’ হামলার শিকার হবেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে জেলার পুলিশ ও র্যাবকে ‘শক্তিশালীভাবে’ সাজাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানালেন এই মানবাধিকার কর্মকর্তা।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি হাজী নূর উদ্দিন মিয়ার কথা, ‘আগের মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে নেই। যেকোনো কারণেই হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগের মতো শক্তিসামর্থ্য ও মনোবল নিয়ে কাজ করতে পারছে না। এই সুযোগটিই দুষ্কৃতিকারীরা নিচ্ছে। প্রশাসনের প্রতি অপরাধীদের ভয় কমেছে, নানা অপরাধ বেড়ে গেছে। এ থেকে উত্তরণ চাইলে এসব নিয়ে গভীরভাবে সরকারকে কাজ করতে হবে।’
অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি
২৩ মে ২০২৬
৬ মাসের এই পরিসংখ্যান ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশ কর্মকর্তাদের। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বললেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জ। পারিবারিক কলহ, মাদকবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, অন্য জেলা থেকে মরদেহ ফেলে যাওয়া— এসব কারণে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে যায়। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে মব কালচার বেড়ে গিয়েছিল। এখনো সেটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জেলায় পুলিশ অনেকবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে, এটি সত্য।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বললেন, ‘ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণাটি আসতে হবে। পুলিশের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে, সেটি ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। আইনের বাইরে পুলিশ অস্ত্র ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
আপাতত পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানালেন এই কর্মকর্তা।







