বরিশাল
চিন্তার ভাঁজ প্রতীমা শিল্পীদের কপালে

ছবি: আগামীর সময়
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব থেকে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন রা। মাটি দিয়ে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের আকৃতি তৈরি করছেন তারা। সঙ্গে মহিষাসুর আর দেবী দুর্গার বাহন সিংহ তো রয়েছেই। তবে এবারে মৃৎ শিল্পীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ্য করা গেছে তাদের সঙ্গে কথা বলে।
মাটি থেকে শুরু করে প্রতীমা তৈরির আনুসাঙ্গিক সরঞ্জামাদির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতীমা নির্মাণে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মজুরি পাচ্ছেন যৎসামান্য। এতে বেশ বিপাকে রয়েছেন তারা। যেখানে কাজ করার সময় তিন বেলা পেটপুরে খাবার খাওয়া হতো, সেখানে খরচা বাঁচাতে দুই বেলা খাবার খেয়ে কাজ করছেন এসব মৃৎ শিল্পিরা। অনেকে এক বেলা ভাত খেয়েই চালিয়ে নিচ্ছেন কাজ। এবারের দুর্গা পূজায় মৃৎ শিল্পীরা কাজ করছেন পেশাদারিত্বের জন্য, নতুবা এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই অনেকটা মুশকিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশালের শ্রীশ্রী শংকর মঠে প্রতীমা তৈরি করতে এসেছেন কার্তিক চন্দ্র পাল। গতবারের দুর্গাপূজার তুলনায় এবারে প্রতীমা তৈরি করছেন কম। সব মিলিয়ে ১২টি প্রতীমা তৈরি করছেন তিনি।
তিনি বলছিলেন, বরিশাল নগরে ৫টি এবং বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় ১টি প্রতীমা তৈরি করছি। গতবছরের তুলনায় এবারে সব কিছুর দাম দ্বিগুণ। তবে সেই তুলনায় পূজা কমিটির বাজেট বাড়েনি। যে কারণে সামান্য লাভ নিয়েই এবারে সমান সমান থাকতে হচ্ছে। গতবছর যে মাটির বস্তা কিনেছি ৩৫০ টাকায়, সেই বস্তা এবারে কিনতে হয়েছে ৫০০ টাকা করে। এ ছাড়া পাট কিনেছিলাম ১৬০ টাকা, সেটার দাম ২২০ টাকা, ৬০০ টাকার নাড়া কিনেছি ১১০০ টাকা করে এবং ৬০ টাকার চট কিনতে হয়েছে ৮০ টাকা দরে। এ ছাড়া বাঁশের দাম তো বেড়েছে অনেক।
কার্তিক পাল আরো বলছিলেন, ৫ জন স্টাফ আমার সঙ্গে প্রতীমা তৈরির কাজ করে। তাদের মজুরিও বেড়েছে। এমন অবস্থায় একটা প্রতীমা তৈরি করে লাভ নেওয়াটা কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। একটা প্রতীমা তৈরির জন্য আমরা যদি ১ লক্ষ টাকা নিয়ে থাকি, তার মধ্যে ৯০ হাজার টাকাই ব্যয় হয় প্রতীমা তৈরিতে। তারপর অনুসাঙ্গিক আরো খরচ রয়েছে, সব মিলিয়ে লাভ রাখা কতটা সম্ভব সেটা আপনারাই বোঝেন।
কার্তিক পালের বড় ভাই রণজিৎ পাল আক্ষেপের সুরে বলেন, আমাদের খরচা বাড়লেও পূজা উদযাপন কমিটি বা মণ্ডপ কমিটিগুলো তাদের বাজেট বাড়ায়নি। তাদের বাজেটের মধ্যেই প্রতীমা তৈরি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোনোদিন একবেলা পেট ভরে খাই, আবার কোনো দিন দুই বেলা। বাজেট সংকটের কারণে এভাবেই কাজ করছি পেশাদারিত্ব ও প্রতীমা শিল্প টিকিয়ে রাখতে।
বাকেরগঞ্জের কলসকাঠির মৃৎ শিল্পী যোগেশ পাল বললেন, প্রতীমা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে লাভের কথা চিন্তা করছি না। একটি প্রতীমা তৈরি করতে সব খরচ দিয়ে যে টাকা লাভ থাকবে তা বলার মতো নয়। আমাদের পূর্ব পুরুষ এই কাজ করে আসছে, যে কারণে আমরাও করছি। কিন্তু এই পেশা টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। আপনি মালামাল কিনতে গেলে বুঝবেন যে মালের দাম কত আর প্রতীমা তৈরিতে আমরা কত টাকা পাচ্ছি।
চারুকলা বরিশালের সাবেক সভাপতি সুশান্ত ঘোষ জানিয়েছেন, মৃৎ শিল্পী বা প্রতীমা শিল্পীদের এই পেশা টিকিয়ে রাখাটা বেশ কষ্টকর। তারপরও আমরা তাদের উৎসাহ দিচ্ছি। প্রতিবছর তাদের জন্য মৃৎ শিল্পী সম্মাননার আয়োজন করে থাকি আমরা বরিশালে। দুর্গা পূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীর দিনে মৃৎ শিল্প প্রদর্শনী ও সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে বরিশাল মহানগর ও জেলা মিলিয়ে এবারে বরিশালে ৬৩৭টি পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এই লক্ষ্যে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতিমূলকসভা করা হয়েছে। সেই সব সভায় নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা বলেছেন, মন্দিরে মন্দিরে এখন প্রতীমা তৈরির কাজ চলছে। এ ছাড়া সকল প্রস্তুতিই গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের সভাগুলোতে আমরা নানা সমস্যার কথা তুলে সেগুলোর সমাধানের দাবী জানিয়েছি।
বরিশাল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জেলার সকল মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক রাখার জন্য জোড়ালো ভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।





