স্থাপনা মানেই হাসানাত-সাদিকের নাম

সেতু, সড়ক, স্কুল-কলেজ, স্টেডিয়াম, অলিগলি, হাসপাতাল, পার্ক, পাঠাগারসহ সরকারি বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করেছেন পরিবারের মৃত সদস্যদের নামে। বাদ যায়নি সাংবাদিকদের সংগঠন প্রেস ক্লাবও। তালিকায় আছে বাস টার্মিনালও। বাবা-ছেলের এমন কাজে বিরক্ত ছিলেন সাধারণ মানুষ। দলের নেতাকর্মীরা তাদের দাপটের কাছে ছিলেন অসহায়।
বরিশালের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণের কাজে যেমন আগ্রাসী ছিলেন তার ছেলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহও চালু রেখেছিলেন বাবার ধারা। ইট-পাথরের স্থাপনায় নাম লিখিয়েই তা স্থায়ী করতে চেয়েছেন বাবা-ছেলে। কিন্তু তা টেকেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলে দেওয়া হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম। ‘তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি বরিশালে করেননি। করেছেন পরিবার ও ব্যক্তিতান্ত্রিক রাজনীতি। বরিশালের এত জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, কখনো তাদের নামে একটি স্থাপনা বা সড়ক নামকরণের উদ্যোগ নেননি হাসানাত ভাই ও সাদিক। তাদের শুধু ধান্দাই ছিল পরিবারের মৃত সদস্যদের নামগুলো বিভিন্ন স্থাপনায় সাঁটিয়ে দেওয়া।’ বলছিলেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা।
২০১১ সালে বরিশাল থেকে পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলায় সড়ক যোগাযোগ চালু করতে কীর্তণখোলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) থেকে এলাকার নাম অনুসারে দপদপিয়া সেতু নামে প্রথমে পরিচিতি পায় এটি। কিন্তু একটি পক্ষ সেতুর নামকরণ শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামে করার দাবি তোলার কিছুদিন পরই বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর চাপে এর নামকরণ হয় তার বাবা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নামে।
শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সরকারি কলেজ, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পাঠাগার, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সড়ক ছাড়াও বরিশাল নগরের একমাত্র স্টেডিয়ামটি বাবার নামে করিয়েছেন হাসানাত।
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। তার হস্তক্ষেপে বরিশাল প্রেস ক্লাবের নামের আগে বসে যায় তার বাবার নাম। নতুন নাম হয় শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেস ক্লাব। বরিশাল আইন মহাবিদ্যালয়ের নামও বাবার নামে করিয়ে নেন হাসানাত। সরকারি বরিশাল কলেজের নামও পাল্টে ফেলতে চেয়েছিলেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনের মুখে পিছু হটেন।
শুধু বাবার নামেই নয়, তার মৃত ছেলের নামেও করিয়েছেন বিভিন্ন স্থাপনা। বরিশাল নগরীতে হয়েছে শহীদ সুকান্ত বাবু শিশু হাসপাতাল, আমানতগঞ্জে শহীদ সুকান্ত বাবু শিশুপার্ক। আগৈলঝাড়া উপজেলায় গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সুকান্ত বাবুর নামে হয়েছে একটি ভবনের নামকরণ। এ ছাড়া হাসানাতের প্রয়াত বোন আরজু মনির নামে করা হয় নগরীর কাউনিয়া এলাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা কমিটির সদস্যসচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলুর জানালেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বরিশালে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নামেই বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন হাসানাত। শিবলুর দাবি, ‘তারা পরিবারের মৃত সদস্যদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটাতেন। জনগণের সম্পদকে নিজেদের পারিবারিক করার চেষ্টা ছিল। ব্যক্তির দানকেও বাধাগ্রস্ত করেছে তাদের এই কার্যক্রম।’
বরিশাল নগরী ও আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-১ অর্থাৎ গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায়ই নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলার জনপ্রতিনিধিদের দিয়েও সেখানে নানা স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ করিয়েছেন হাসানাত আব্দুল্লাহ।
এ কাজে বাবার পথেই হেঁটেছেন ছেলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। সাদিক মেয়র থাকাকালে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তার প্রয়াত মা সাহান আরা বেগমের নামে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শিশুপার্ক নির্মাণ করেছিলেন সওজের জমিতে। দাদা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নামে ট্রাক টার্মিনাল ও বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের নামকরণও করেছিলেন। পাশাপাশি রূপাতলী বাস ও মিনিবাস টার্মিনালের নাম বদলে করেন বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নামে।
বরিশাল নগরীর দুই প্রবেশমুখে নির্মাণাধীন সিটি গেট দুটিও শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নামে করার চেষ্টা ছিল সাদিকের, তবে মেয়রের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তার সেই আশা আর পূরণ হয়নি। তবে মেয়র থাকাকালে বরিশালের বেশ কয়েকটি সড়ক ও অলিগলি নিজের মৃত আত্মীয়স্বজনদের নামে করিয়ে নিয়েছেন সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের বিভাগীয় সমন্বয়ক রফিকুল আলম বললেন, ‘বিষয়টি খুবই হাস্যকর। অন্যের জায়গা বা জনগণের প্রতিষ্ঠান, জনগণের টাকায় তৈরি স্থাপনা ক্ষমতা খাটিয়ে নিজের বাপ-দাদার নামে নামকরণ করাটা লজ্জার।’
‘এখন আপনারা নেই, আপনাদের দেওয়া নামগুলোও নেই। জনগণের অর্থায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান অবশ্যই স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে নামকরণ হতে পারে। আপনাদের বাবা-দাদার নামেও হতে পারে। তবে যেখানে জায়গা পাবেন সেখানেই লাগিয়ে দেবেন, এমনটা হতে পারে না’ যোগ করেন তিনি।




