তেঁতুলিয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে আজও হারানো ভিটার স্মৃতি খোঁজেন নুর নাহার

ছবি: আগামীর সময়
তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন নুর নাহার বেগম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, চোখে জীবনের কঠিন সংগ্রামের ছাপ। সামনে বিস্তীর্ণ নদীর জলরাশি। সেই দিকেই স্থির দৃষ্টি। যেখানে একসময় ছিল তার ঘরবাড়ি, উঠান, গাছপালা আর সুখের সংসার।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে নুর নাহার বধূ হয়ে আসেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সদর ইউনিয়ন কেদিরহাট এলাকার তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ের বাড়িটিতে। সেখানে তার সংসার শুরু হয়েছিল স্বচ্ছলতায়। তিন কানি জমি, বসতভিটা, গবাদি পশু আর ফসলি মাঠে ঘেরা ছিল তাদের সংসার। কিন্তু ধীরে ধীরে সব কেড়ে নেয় তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন। প্রথমে জমি, পরে বসতভিটা। একসময় পুরো ভিটেই বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে।
নুর নাহার বলেছেন, ‘একদিনে কিছু হারায়নি, ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেছে সব। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম জমির আরেক অংশ নদীতে চলে গেছে। এভাবেই একসময় পুরো ভিটে হারিয়ে যায়।’
সব হারিয়ে নুর নাহারের পরিবার আশ্রয় নেয় দুর্গম চরাঞ্চলে। সেখানে নেই স্থায়ী নিরাপত্তা, নেই নিশ্চিন্ত জীবন। শুরু হয় প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের সঙ্গেই কেটে যায় জীবনের বড় এক অংশ।
চার ছেলে ও এক মেয়েকে ঘিরে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতার চাপে সেগুলো পূরণ হয়নি। সন্তানরা জীবিকার তাগিদে কেউ জেলে, কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত।
বর্তমানে নুর নাহারের বয়স প্রায় ৬৫ বছর। স্বামীও বার্ধক্যের কারণে প্রায় কর্মক্ষমতা হারানোর পথে। তবে স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি হারানো ভিটে। মাঝে মাঝে তিনি ফিরে আসেন তেঁতুলিয়া নদীর তীরে। যেখানে একসময় ছিল ঘর, উঠান, আমগাছ, নারিকেল গাছ আর পরিবারের হাসি। এখন সেখানে শুধু জল আর ঢেউয়ের শব্দ।
নদীর দিকে তাকিয়ে নুর নাহার জানায়, এই জায়গাতেই ছিল তাদের ঘর, ছিল আমগাছ, নারিকেল গাছ। একসময় সুখে ভরা সংসার ছিল। চোখ বন্ধ করলে সব দেখা যায়, খুললে কিছুই থাকে না।
নুর নাহারের জীবনগল্প শুধু একজন নারীর স্মৃতি নয়, এটি তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে বাস্তুচ্যুত অসংখ্য মানুষের প্রতিচ্ছবি। যারা একসময় জমির মালিক ছিলেন, আজ তারা ভূমিহীন হয়ে শুধু স্মৃতিতে বেঁচে আছেন।
সন্ধার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলে নুর নাহার ফিরে যান বর্তমান ঠিকানায়। কিন্তু চোখের ভেতর তখনও ভেসে থাকে সেই হারানো ভিটে, যেখানে একদিন ছিল তার পুরো পৃথিবী।




