পেকুয়া
প্যারাবন কেটে মৎস্যঘের

পেকুয়ায় উপকূলীয় প্যারাবন কেটে মৎস্যঘের সম্প্রসারণ এবং স্কেভেটর দিয়ে চরের মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, ছবি : আগামীর সময়
কক্সবাজারের পেকুয়ায় উপকূলীয় প্যারাবন কেটে মৎস্যঘের সম্প্রসারণ এবং এক্সকাভেটর দিয়ে চরের মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম উজানটিয়ার করিমদাদ মিয়া ঘাটসংলগ্ন উজানটিয়া চ্যানেল এলাকায় কয়েক দিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চললেও বন বিভাগের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উজানটিয়া ইউনিয়নের নয়াপাড়ার শফি ও মিয়াপাড়ার মকবুল বহদ্দার এলাকায় সম্প্রতি প্যারাবন কেটে মৎস্যঘের সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্যারাবনের অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এরপর গতকাল রবিবার থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে প্রায় ১০ একর জায়গার মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মৎস্যঘের তৈরির জন্য প্যারাবন উজাড়ের পাশাপাশি চরের মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করা হলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও ভূমির ভারসাম্যও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের দাবি, প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় ঢেউয়ের শক্তি কমানো, উপকূলীয় ভূমিক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মাছসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণীর প্রজননক্ষেত্র তৈরিতে প্যারাবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে নির্বিচারে প্যারাবন কেটে মৎস্যঘের সম্প্রসারণ করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে উপকূলীয় জনপদ ও পরিবেশের ওপর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে প্যারাবন নিধন ও মাটি কাটার কাজ চললেও শুরুতে উপকূলীয় বন বিভাগের তৎপরতা দৃশ্যমান ছিল না। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে লোক পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মগনামা বিট কর্মকর্তা হোসেন তওফিক বলেছেন, বিষয়টি জানার পরপরই বিট কার্যালয় থেকে লোক পাঠানো হয়েছে। মাটি কাটা বন্ধ এবং এক্সকাভেটর সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে প্যারাবন কাটার অভিযোগ অস্বীকার না করে অভিযুক্ত শফি বলেছেন, প্যারাবন আগে থেকেই কাটা ছিল। সেখানে আগে থেকেই একটি মাছের ঘের ছিল। মৎস্যঘের করার জন্য তিনি এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দিয়েছেন মাত্র।
অন্য অভিযুক্ত মফিজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বললেন, ‘শফি নামে একজন এ ঘটনায় জড়িত। তিনিই প্যারাবন কেটে বাঁধ তৈরি করছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শিমুল বলেছেন, জায়গাটি তারা ‘মাথাকিলা’ হিসেবে দেখাশোনা করে থাকেন। তাদের কাছ থেকে শফি ও মফিজ বর্গা নিয়ে তাদের অগোচরে প্যারাবন কেটে বাঁধ তৈরি করেছেন। বিষয়টি জানার পর তারা বন বিভাগকে অবগত করেছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেছেন, শফি একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন মৎস্যঘের ইজারা নিয়েছেন। ইজারা নেওয়ার পর বাঁধে ছিদ্র হয়ে পানি বের হয়ে যাওয়ার অজুহাতে তিনি মাটি তোলেন। পরে পাশের আরও কিছু জায়গা দখলে নিয়ে নতুন বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারের নির্দেশে অভিযুক্ত ব্যক্তির এক্সকাভেটর জিম্মায় রাখার পাশাপাশি বাঁধটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নদীর জায়গা দখল ও প্যারাবন কেটে মাছের ঘের নির্মাণ কোনোভাবেই করতে দেওয়া হবে না। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহর ভাষ্য, উপকূলীয় প্যারাবন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, এটি উপকূলের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বেষ্টনী। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমানো, উপকূলীয় ভূমিক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্যারাবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্বিচারে প্যারাবন ধ্বংস করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে উপকূলীয় জনপদে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই প্যারাবন নিধন বন্ধের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আবার প্যারাবন সৃষ্টি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।




