এনসিপির মাদারীপুর কমিটিতে বিএনপি-আ.লীগের সাবেক নেতারা

এনসিপির মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়া। ছবি : আগামীর সময়
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। কমিটি ঘোষণা করার পর থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
তার কারণ কমিটির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়া একসময় বিএনপির রাজনীতিতে ছিলেন, পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ওঠে। সদস্য সচিব ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানও ছিলেন বিএনপির নেতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহর সই করা চিঠিতে ৩৪ সদস্যের মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে আতিকুর রহমান হাওলাদারকে। সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হয়েছেন মো. ফরহাদ হোসেন। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক, যুগ্ম সদস্য সচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে আরও নেতাকে রাখা হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এনসিপি। মাদারীপুরে সংগঠন গুছিয়ে তুলতে দলটি পুরনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করেছে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
তুষার ভূঁইয়া মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। সরকারি গেজেটেও তাকে ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, তুষার ভূঁইয়া একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ে তিনি সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
২০১১ সালে সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তুষার ভূঁইয়া। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিমের অনুসারী হন বলে দাবি স্থানীয় কয়েকটি রাজনৈতিক মহলের।
এ ছাড়া বাহাউদ্দিন নাসিমের ছোট ভাই ও মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেই সুবাদে তিনি বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও দাবি করে স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তুষার ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মূলত বিএনপি পরিবার। আমার বাবা নেতা ছিলেন। সেই সুবাদে আমরা বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছি। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাদের সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। তাই নতুনদের নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। সেজন্যই নতুনদের দল এনসিপিতে যোগ দিয়েছি।’
আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তুষার ভূঁইয়া বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি। এ বিষয়ে আর কিছু বলতে পারব না।’
তবে তুষার ভূঁইয়ার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. হাসিবুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘এবার এনসিপির জেলা কমিটিতে আওয়ামী লীগের তুষার ভূঁইয়াকে দেওয়া হয়েছে। তার আজীবন সংগ্রাম ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি গণঅভ্যুত্থানের বিরোধী ছিলেন। জেলায় কীভাবে একজন আওয়ামী লীগের অনুসারীকে এনসিপির নেতা বানানো হলো, এটা শুনে আমরা অবাক। দলের জন্য কাজ করলাম আমরা, নেতা হলো কে?’
এদিকে জেলা সদস্য সচিব হিসেবে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানের নিয়োগ নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর এখন এনসিপির জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবচর উপজেলা বিএনপির এক নেতা দাবি করেছেন, রোমান বিএনপিতে থাকার সময় নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। এ কারণে তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। রোমান সুবিধাবাদী এবং যেখানে সুবিধা পান, সেখানেই রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এনসিপির জেলা কমিটিতে সাবেক বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ায় দলটির নতুন রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, কোনো ব্যক্তি আগে অন্য রাজনৈতিক দল করলে নতুন দলে যোগ দিতে পারবেন না, এমন নিয়ম নেই। তবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলা হলে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
একাধিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেছেন, তুষার ভূঁইয়া দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। এমনকি তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদনও করেছিলেন বলে দাবি তাদের।




