মাদারীপুর
তীব্র লোডশেডিংয়েও ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিল

প্রতীকী ছবি
তীব্র গরমে বিদ্যুতের জন্য যখন মানুষের অপেক্ষা ফুরাচ্ছে না, তখন নতুন করে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল। মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের অভিযোগ, স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি বিল দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন শহর ও গ্রামের মানুষ।
গ্রাহকদের ভাষ্য, আগে যে পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার থেকে দেড়-দুই হাজার টাকার মধ্যে থাকত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেখানে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল এসেছে। এতে অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার খরচে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের কেউ কেউ বলছেন, মিটারের প্রকৃত রিডিং না দেখে অনুমানের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হচ্ছে। আবার কোনো মাসে কম ইউনিট দেখিয়ে পরের মাসে তা একসঙ্গে যোগ করা, মিটার রিডিংয়ের ভুল এবং কিছু ডিজিটাল মিটারের ত্রুটির কারণেও বিল অস্বাভাবিক হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা তাদের।
মাদারীপুর পৌর শহরের মুক্তাবিড়ি রোড এলাকার বাসিন্দা তন্দ্রা বেগম বলেন, লাইলা বেগম নামে জুন মাসে তার বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৬ হাজার ৪৬৭ টাকা। জুলাই মাসে বিল এসেছে ৩ হাজার ৫৭৮ টাকা। অথচ আগে প্রতি মাসে তার বিল আসত ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে।
তন্দ্রা বেগম বলেন, ‘আমি বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থাকি। তাহলে এত বেশি বিল কীভাবে হলো সেটাই বুঝতে পারছি না। যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ-ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না, সেখানে এত টাকা বিল কীভাবে আসে? এভাবে মনগড়া বিল দিয়ে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে।’
ডাসার এলাকার ভ্যানচালক মোতালেব কাজীর বাড়িতে এপ্রিল মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছিল ১ হাজার ৩১৪ টাকা। চলতি মাসে তার বিল হয়েছে ৪ হাজার ২৯৩ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ২ হাজার ৯৭৯ টাকা।
মোতালেব কাজী বলেন, ‘মোরা গরিব মানুষ। ভ্যান চালাইয়া দিন আনি, দিন খাই। বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি এই ২ হাজার ৯৭৯ টাকা মুই কইত্তোন দিমু?’
ধামুসা গ্রামের গ্রাহক রাজ্জাক ঢালীর অভিযোগও একই ধরনের। তার ভাষ্য, এক মাসে ৫৪৫ টাকা বিল এলেও পরের দিকে তা বেড়ে ২ হাজার ২৭১ টাকা হয়েছে। অস্বাভাবিক এই বিলের দ্রুত সমাধান চান তিনি।
অতিরিক্ত বিলের অভিযোগের বিষয়ে ডাসার সাব-জোনাল অফিসের এজিএম মো. তৌহিদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ জোনাব আলী বলেন, ‘ডাসারের সংশ্লিষ্ট অফিস থেকেই বিল তৈরি ও আদায় করা হয়। অস্বাভাবিক বিলের বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।’
তবে জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় বলেন, ‘কোনো গ্রাহক অতিরিক্ত বিল পাওয়ার অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট জোনাল অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর মিটার ও বিল যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এপ্রিলের শুরু থেকে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। অফিস, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানাসহ নানা খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে।’ এ কারণে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে অস্বাভাবিক বিলের পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘাটতিও ভোগাচ্ছে মাদারীপুরের বাসিন্দাদের। বিদ্যুৎ বিতরণসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদা প্রায় ১৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১১ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য চাহিদা প্রায় ১০৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫২ মেগাওয়াট। ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে লোডশেডিং বণ্টন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আরেক হিসাবে, জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। ফলে গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এ অবস্থায় গ্রাহকদের দাবি, শুধু লোডশেডিং কমানো নয়, বিদ্যুতের বিল নিয়েও মাঠপর্যায়ে তদন্ত প্রয়োজন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটারের প্রকৃত রিডিং যাচাই, ভুল বা অতিরিক্ত বিল সংশোধন এবং বিল তৈরিতে কোনো অনিয়ম থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।







